পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. গোলাম সরোয়ার হাওলাদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, সরকারি চাল আত্মসাৎ ও জমি দখলের মতো গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এলাকায় প্রভাবশালী এই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠলেও স্থানীয় প্রভাবের কারণে বরাবরই তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন। তবে সর্বশেষ গত ৩০ মে পোলেরহাট বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে চাঁদা দাবি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা এই জনপ্রতিনিধির বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পোলেরহাট বাজারে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও রক্তক্ষয়ী হামলা
গত ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমরাগাছিয়া পোলেরহাট বাজারে স্থানীয় বিএনপির উদ্যোগে অস্থায়ী কার্যালয়ে দোয়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। এই অনুষ্ঠান চলাকালেই সেখানে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাজারের সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতেই এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়।
হামলার শিকার রিপন খান ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন, “গত ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর উপলক্ষে আমরা বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ে দোয়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করি। জাকির ফরাজী ও মেম্বার সরোয়ার হাওলাদার এসে বিএনপির কার্যালয় করায় আমাদের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং হুমকি-ধামকি প্রদান করে।”
তিনি আরও বলেন, “এ সময় আমরা চাঁদা না দিলে এক পর্যায়ে তাদের হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্র ও ছুরি দিয়ে আমার গলায় আঘাত করে। আমি হাত দিয়ে ঠেকাতে গেলে আমার হাতে তিনটা কোপ লাগে। এসময় কুদ্দুস সহ স্থানীয়রা আমাকে উদ্ধার করে। চাঁদা না দিলে আমাকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেয়, আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবি জানাই।”
পৈত্রিক সম্পত্তি জবরদখল ও আইনি বঞ্চনা
কেবল চাঁদাবাজি ও হামলাই নয়, মেম্বার সরোয়ারের বিরুদ্ধে নিজের আত্মীয়দের পৈত্রিক সম্পত্তি জবরদখলের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মরহুম ছন্দু হাওলাদারের ৬ মেয়ে ও ১ ছেলের মধ্যে বড় মেয়ে ছিলেন আছিয়া খাতুন। নিয়ম অনুযায়ী পিতার সম্পত্তিতে তার ন্যায্য অধিকার ছিল।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আছিয়া খাতুন মারা যাওয়ার পর তার সন্তানদের পাওনা বুঝিয়ে না দিয়ে মেম্বার গোলাম সরোয়ার হাওলাদার, আলাম হাওলাদার, রাজ্জাক হাওলাদার যোগসাজশে পুরো জমিটি জবরদখল করে রেখেছেন। ওয়ারিশদের কাছে জমিটির বৈধ দলিল ও সমস্ত কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তারা অসহায়। স্থানীয় থানায় একাধিকবার অভিযোগ করেও প্রভাবশালীদের দাপটে আজ পর্যন্ত তারা নিজেদের অধিকার বুঝে পাননি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার অপব্যবহার
স্থানীয় পর্যায়ে মেম্বার সরোয়ার হাওলাদারের রাজনৈতিক ভোলবদল নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, নিজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করতেই তিনি বারবার রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নিয়েছেন। ২০২১ সালে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এরপর তিনি দ্রুত তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং সেই প্রভাব খাটিয়ে ৪ নম্বর ওয়ান্দের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে, তিনি আইনি ঝামেলা ও জবাবদিহিতা থেকে বাঁচতে পুনরায় রাতারাতি বিএনপিতে ফিরে আসেন। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের এই কৌশলকে কাজে লাগিয়েই তিনি এলাকায় নতুন করে অত্যাচার ও নিজের আধিপত্য টিকিয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরকারি চাল চুরি ও গণধোলাই: তবু বেপরোয়া সরোয়ার মেম্বার
সরোয়ার মেম্বারের দুর্নীতির তালিকা দীর্ঘ। জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’ ও ‘দৈনিক দেশের কথা’-সহ একাধিক গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি চাল আত্মসাৎ, ভুয়া তালিকা তৈরি করে ভুতুড়ে ব্যক্তিদের নামে চাল উত্তোলনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৃত সুবিধাভোগীরা তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এই জালিয়াতির জন্য জনগণের হাতে গণধোলাইয়ের শিকার হওয়ার মতো লঙ্কাকাণ্ড ঘটলেও, তার চরিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তিনি।
প্রশাসনের নীরবতায় জনমনে ক্ষোভ
একের পর এক অপরাধ, গণমাধ্যমের অকাট্য তথ্য-উপাত্ত এবং প্রকাশ্যে রক্ত ঝরানোর মতো গুরুতর ঘটনার পরও মেম্বার সরোয়ারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে সচেতন মহল অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা সরোয়ার হাওলাদারকে গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে মেম্বার গোলাম সরোয়ার হাওলাদারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তদন্তসাপেক্ষে এই অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মির্জাগঞ্জে অপরাধের মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা এলাকাবাসীর।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জাগঞ্জ থানার এসআই (উপ-পরিদর্শক) বাদল জানান, বিষয়টি নিয়ে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী আগামীকাল উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনা ও সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান না হলে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।









