অনেকের কাছে পাঠ্যবই পড়ার চেয়ে বড় কোনো বিড়ম্বনা নেই, আবার অনেকের কাছে বই-ই হলো নিঃশ্বাস নেওয়ার অবাধ বাতাস। বিচারালয়ের সুবিশাল আর জটিল আইনি পরিমণ্ডলে যিনি আজ নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়েছেন, সেই মোঃ শামীম আহমেদের জীবনের গল্পটি কেবল আইনের ধারা মুখস্থ করার নয়; এটি অক্ষরের প্রতি এক কিশোরের উন্মাতাল প্রেম, জ্ঞানের অতল সাগরে অবগাহন এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতায় নিজেকে খাঁটি সোনায় পরিণত করার এক মহাকাব্যিক আখ্যান।
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৭২তম স্থান অধিকার করে সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত এই তরুণ আইনবিদ প্রমাণ করেছেন বইয়ের নেশা এবং যুক্তির দীক্ষা মানুষকে যেকোনো দুর্গম চূড়ায় পৌঁছে দিতে পারে।
বইয়ের প্রতি আদিগন্ত প্রেম: দুই হাজার বইয়ের এক ব্যক্তিগত মহাবিশ্ব
শামীম আহমেদের জ্ঞানতৃষ্ণা সাধারণ কোনো মাপকাঠিতে মাপা যায় না। এ পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি বই পড়ে শেষ করেছেন তিনি। এই আসক্তির সূচনা হয়েছিল মীর মশাররফ হোসেনের কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘বিষাদ-সিন্ধু’ পাঠের মধ্য দিয়ে। কারবালার সেই বিষাদগাথা কিশোর শামীমের চিত্তে সাহিত্যের এমন এক অমোঘ তৃষ্ণা জাগিয়ে তুলেছিল, যা আর কোনোদিন স্তব্ধ হয়নি। একে একে তিনি নিমগ্ন হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জহির রায়হান, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জুলভার্ন, ডেল কার্নেগি, হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাহিত্যের অনন্ত মোহনায়।
অভাবের সংসারে যেখানে বই কেনা ছিল একপ্রকার বিলাসিতা, সেখানে শামীম খুঁজে নিয়েছিলেন নিজস্ব পথ।
পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পাওয়া ট্যালেন্টপুল বৃত্তির সমস্ত টাকা তিনি তুলে দিয়েছিলেন বইয়ের দোকানে।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই শুরু করেছিলেন টিউশনি। সেই টিউশনির জমানো টাকায় জামা-কাপড় নয়, প্রতি মাসেই কিনতেন সাহিত্যের বই।
ফলে আজকের দিনে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে গড়ে উঠেছে এক ঈর্ষণীয় ও সমৃদ্ধ বইয়ের সাম্রাজ্য।
মনিপুরের সেই পড়ার টেবিল: “সারাক্ষণ বসে থাকলে তো প্যারালাইজড হয়ে যাবা!”
শৈশবে যিনি স্কুল থেকে পালাতেন, সেই তিনিই নানা বাড়ি মনিপুরে এসে পড়ার টেবিলে নিজেকে এমনভাবে সঁপে দিয়েছিলেন যা আজও গ্রামবাসীদের মুখে মুখে ফেরে। তখন তিনি সপ্তম কি অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন। খাওয়া, গোসল আর নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া তাঁর কোনো অস্তিত্ব পড়ার টেবিল থেকে আলাদা করা যেত না।
পাশের বাড়ির এক নানা প্রায়ই মসজিদে যেতেন। তিনি মাগরিবের নামাজে যাওয়ার সময় দেখতেন শামীম টেবিলে পড়ছেন; এশার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময়ও কানে আসত শামীমের কণ্ঠস্থ পড়ার সুর; এমনকি গভীর রাতে যখন তিনি তাহাজ্জুদের নামাজে যেতেন, তখনও দেখতেন কুপি বা বাতির আলোয় শামীম অবিচল পড়ে চলেছেন। একদিন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সেই নানা বলেই ফেলেছিলেন—“সারাক্ষণ এভাবে পড়ার টেবিলে বসে থাকলে তো প্যারালাইজড হয়ে যাবা!”
শামীম আহমেদ হাসিমুখে স্মৃতিচারণ করে বলেন—
“জীবনের শুরুর দিকে আমাকে কেউ পড়ার টেবিলে বসাতে পারত না। আর জীবনের একটা মোড়ে এসে এমন হলো যে, পড়ার টেবিল থেকে আমাকে কেউ ওঠাতে পারত না। পড়াশোনা ছাড়া পৃথিবীর কোনো কিছুই তখন আর ভালো লাগত না।”
যুক্তির মঞ্চ ও নেতৃত্বের দ্যুতি: ক্যাম্পাসের প্রাণবন্ত কাণ্ডারি
বিশাল পাঠাভ্যাস শামীমকে কেবল অন্তর্মুখী করেনি, বরং তাঁকে বানিয়েছে অসম্ভব বাকপটু ও যুক্তিবাদী। স্কুল জীবনেই বিতর্ক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাঁর বাগ্মিতার উন্মেষ ঘটেছিল। উচ্চশিক্ষায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি হয়ে ওঠেন ক্যাম্পাসের এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের মূল মধ্যমণি।
বিতর্ক ও কূটনীতি: কুমিল্লা ডিবেট ফেডারেশনের (CUDF) সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় মডেল ইউনাইটেড নেশনস অ্যাসোসিয়েশনের (CUMUNA) সহ-সভাপতি হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির চর্চাকে বেগবান করেছেন।
আন্তর্জাতিক মুট কোর্ট: বিশ্বখ্যাত ‘ফিলিপ সি. জেসাপ ইন্টারন্যাশনাল ল মুট কোর্ট কম্পিটিশন’-এর জাতীয় রাউন্ড পেরিয়ে বৈশ্বিক পর্ব (Global Rounds)-এ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং লাভ করেছেন সম্মানজনক ‘Spirit of Jessup’ অ্যাওয়ার্ড।
সংগঠন গড়ার রূপকার: ‘দ্যা নেটওয়ার্ক ফর ইন্টারন্যাশনাল ল স্টুডেন্টস’ (NILS)-এর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাপ্টারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় আইন পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ইঞ্জেনিয়াস প্ল্যাটফর্ম’ (Ingenious Platform)।
ক্যাম্পাসে ও জাতীয় পর্যায়ে শত শত সেমিনার, কর্মশালা, বিতর্ক ও মুটকোর্ট আয়োজনের নেপথ্য কারিগর ছিলেন তিনি।
পরবর্তীকালে সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (বাইউস্ট)-এর আইন বিভাগে অধ্যাপনাকালেও তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে এই জ্ঞান ও নেতৃত্বের চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছেন।
সহশিক্ষা ও সাহিত্যের আলোয় বিজেএস জয়
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত বই পড়া আর শত শত ইভেন্ট আয়োজনের ভিড়ে বিজেএস-এর মতো কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে সম্ভব হলো? শামীম আহমেদ একে বাধা হিসেবে নয়, বরং নিজের শক্তির জায়গা হিসেবে দেখেন:
“সাহিত্যের দুই হাজার বই আমাকে শিখিয়েছে মানুষের হৃদয়, মনস্তত্ত্ব ও সমাজকে গভীরভাবে অনুভব করতে। আর সহশিক্ষা কার্যক্রম ও বিতর্ক আমাকে শিখিয়েছে স্নায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করে আত্মবিশ্বাসের সাথে যুক্তি উপস্থাপন করতে। বিচারকের ভাইভা বোর্ডে যখন হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, তখন এই বহুমাত্রিক পঠনপাঠন ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাই আমার সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”
আগামীর স্বপ্ন: ন্যায়বিচারের সোপানে
হোমনার প্রত্যন্ত চান্দেরচর ও মনিপুরের কাদামাটি মেখে বেড়ে ওঠা, টিউশনি আর বৃত্তির টাকায় বই কিনে জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটানো সেই দামাল ছেলেটি আজ দেশের বিচার বিভাগের গর্বিত অংশ।
যিনি কৈশোরে মশাররফ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ আর হুমায়ূনের পাতায় মানবজীবনের টানাপোড়েন চিনেছেন, যৌবনে ফিলিপ সি. জেসাপের আন্তর্জাতিক মঞ্চে আইনের ধারায় শাণিত হয়েছেন তিনি যখন বিচারাসনে বসবেন, তখন সেখানে কেবল আইনের কঠিন মারপ্যাঁচ থাকবে না; থাকবে প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও ইনসাফের এক অমলিন প্রকাশ। মোঃ শামীম আহমেদের এই লড়াই বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের মনে করিয়ে দেয় বই ও আত্মবিশ্বাসের ওপর যার অগাধ আস্থা, প্রতিকূলতার কোনো দেওয়ালই তাঁর পথ রুখতে পারে না।




























