অর্থনীতি ডেস্ক: সিলিন্ডারজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম বারবার সমন্বয় করেও খুচরা বাজারে তার সুফল নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি নতুন মূল্য নির্ধারণ করলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা তা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করছেন। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগের মতোই অতিরিক্ত মূল্যে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। সরকারি সংস্থাটির পক্ষ থেকে নির্ধারিত দাম বাড়িয়ে দেওয়ার পরও বাজারে এই কারসাজি অব্যাহত থাকায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ক্রেতারা। দুর্বল তদারকি এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারির অভাবকেই এই দুরবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে এলপি গ্যাসের পর্যাপ্ত আমদানি হওয়া সত্ত্বেও গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে হঠাৎ করেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চাহিদা অনুযায়ী আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও কিছু অসাধু চক্র বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে লাইসেন্সধারী কোম্পানিগুলোর বৈঠক হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত সরবরাহের দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। এই কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে ঠিক কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালানো হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি, যা সংকটের অজুহাতে কোথাও কোথাও আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতির চাপে গত বছরের অক্টোবর মাসে দাম বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার খুচরা বাজারে এই নতুন মূল্য তালিকা কার্যকর হয়নি বললেই চলে। স্থান ও কোম্পানিভেদে গ্রাহকদের এখনো প্রতি সিলিন্ডারের জন্য দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করতে হচ্ছে। ডিলাররা সরবরাহ কমার অভিযোগ তুললেও কোম্পানিগুলো আবার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর দায় চাপাচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বর্তমানে দেশে ৩২টি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস আমদানি ও বাজারজাতকরণের লাইসেন্স পেলেও নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানি এই কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছে। সরকারি তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ এলপি গ্যাস আমদানি করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট বেশি। এর পরও বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিইআরসি নিজস্ব উদ্যোগে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। আমদানি পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবেশক ও ডিলার—কোথায় এবং কীভাবে এই অনিয়ম ঘটছে, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তবে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ী ও পরিবেশকদের দাবি, পরিবহন খরচ, গুদাম ভাড়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক বাজারে এলপি গ্যাসের চড়া দাম নেওয়ার সুনির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে। ভোলা, টাঙ্গাইল, চাঁদপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নোয়াখালীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দুই থেকে তিন শ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করা হচ্ছে। গ্যাস সংকটের সুযোগ নিয়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা উভয় পক্ষই মজুতদারির মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা লুফে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিইআরসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারের অস্থিতিশীলতার পেছনে জড়িত স্পর্শকাতর তথ্যগুলো নিয়ে বর্তমানে নিবিড়ভাবে কাজ করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই এই কারসাজির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্তদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।


































