অর্থনীতি ডেস্ক: চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যস্ত করেছে সরকার। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় উভয়পক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিদেশি এই গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৫ বছর এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটি পরিচালনা করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং পরবর্তীতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করা হতে পারে। বিগত বিভিন্ন সরকারের আমল থেকেই এই প্রক্রিয়া চলে আসলেও সম্প্রতি চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির দায়িত্ব দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের শুরু থেকেই বন্দর শ্রমিক-কর্মচারী, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, বামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন। সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অতীতে বন্দরে বিভিন্ন সময় কর্মবিরতি, মহাসড়ক অবরোধ এবং বন্দর ভবন ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের শেষ দিকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতৃত্বে বিভিন্ন সংগঠন টানা নয় দিন বন্দর সচল রাখার আন্দোলনও করেছে। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর তীব্র আপত্তি ও আন্দোলন সত্ত্বেও সরকার চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। বর্তমানে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সবাই উপলব্ধি করছেন।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বা অফডক মালিকদের সংগঠন বিকডার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল পদ্ধতি বিশ্বের অন্যান্য আন্তর্জাতিক বন্দরের তুলনায় কিছুটা আলাদা। এখানে বন্দরের ভেতরেই কনটেইনার খুলে পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার প্রচলন রয়েছে, যা ডিপি ওয়ার্ল্ডের জন্য সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা হতে পারে। এছাড়া কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রিতা এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা দূর করতে না পারলে আন্তর্জাতিক এই অপারেটর প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী ও সংগঠনের পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। বিজিএমইএর প্রতিনিধিরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক মানের এই অপারেটর আসলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়বে এবং জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী ও এর বিস্তারিত বিষয়বস্তু দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাখা হলেও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। জানা গেছে, টার্মিনাল আধুনিকায়ন, নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দুবাইয়ের এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন পাঁচ কোটি ডলার প্রদান করা হবে এবং চুক্তি অনুযায়ী বার্ষিক ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে অপারেটরকে আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। এদিকে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এত বড় একটি কৌশলগত চুক্তির বিষয়ে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি, যা তাদের অন্ধকারে রেখেই সম্পন্ন করা হয়েছে।
































