জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞতার ভুয়া সনদে এবং নিয়োগের শর্তপূরণ ছাড়াই পেশ ইমাম পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনিয়মের অভিযোগে একজন চাকরিপ্রার্থী হাইকোর্টে রিট করলে হাইকোর্ট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টি তদন্ত করে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিলেও এখনও জমা হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন। শুধু তাই নয়, অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন এবং কমিটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সেই প্রতিবেদন আমলে না নিয়েই নতুন করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইমাম নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি ধাপাচাপা দিতে চাইছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে পেশ ইমাম পদে নিয়োগের জন্য আবেদন চাওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, বড় কোনো মসজিদ থেকে কমপক্ষে পাঁচ বছরের ইমামতির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
অভিজ্ঞতা সনদে ঢাকার আফতাব নগরের লেকভিউ অ্যাভিনিউতে অবস্থিত বায়তুল মামুর জামে মসজিদে খতিব হিসেবে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার সনদ দেখিয়ে আবেদন করেন নিয়োগপ্রাপ্ত ইমাম আব্দুল হাকিম। মসজিদ কমিটির সভাপতি আবু সুফিয়ান স্বাক্ষরিত সনদটিতে ১ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা দেখানো হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকে যে মসজিদটিতে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে সেই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২১ সালে। ২০১৯ সালে সেই মসজিদের কোনো অস্তিত্বই ছিলনা। এছাড়া সনদে মসজিদ কমিটির সভাপতি আবু সুফিয়ানের যে স্বাক্ষর রয়েছে সেটিও তিনি করেননি।
এ বিষয়ে বায়তুল মামুর জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমাদের মসজিদটি যেখানে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে ২০১৯ সাল থেকে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। অভিজ্ঞতার সনদে আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি।’
এ ঘটনায় নিয়োগপ্রাপ্ত ইমাম আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে অভিজ্ঞতা সনদ জাল, স্বাক্ষর জালিয়াতি, সংযুক্ত ৩ টি আরবি সনদ ও স্বাক্ষর জাল, সত্যায়নবিহিন সনদ, বয়স নিয়ে ৪ বছরের কারচুপি সহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে নিয়োগ কার্যক্রম পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন ইমাম নিয়োগের ভাইবায় অংশগ্রহণকারী মুন্সিগঞ্জের দক্ষিণ কোলাপাড়া জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মানজুর মুরশিদ মুরাদ। আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং-৮২৯৫/২০২৫।
হাইকোর্ট রিটটি আমলে নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে ২০২৫ সালের ৪ জুনের মধ্যে নিষ্পতি করার নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। আদালতের নির্দেশে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত হোসেন সরকারকে আহ্বায়ক এবং ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরকে সদস্য সচিব করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ৩ জুলাই তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ইমাম হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আব্দুল হাকিমের ভূয়া অভিজ্ঞতা সনদ এবং স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টির সত্যতা রয়েছে এবং তদন্ত কমিটির কাছে আব্দুল হাকিম তা স্বীকারও করেছেন।
তবে ড. সাখাওয়াত হোসেন সরকারের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমলে না নিয়েই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন মজুমদারকে আহ্বায়ক এবং নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরকে সদস্য সচিব করে তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি এখনও তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
অভিযোগ আছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ইমাম নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং এজন্য নতুন আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে গত ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইমাম নিয়োগে অনিয়মের তদন্তের অগ্রগতি জানতে চেয়ে তাগাদা দেয় হাইকোর্ট।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১ম তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ড. সাখাওয়াত হোসেন সরকার বলেন, ‘ইমাম নিয়োগের অনিয়মের অভিযোগের বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য প্রথমে যে কমিটি করা হয়েছিল আমরা যাচাই-বাছাই শেষে আমাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছি। পরবর্তীতে নতুন করে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয় সেখানেও আমাদের রাখা হয়েছিল কিন্তু আমরা আমাদের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছি।’
২য় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে সদস্য সচিব ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘রিপোর্ট এখনো জমা দেওয়া হয়নি।’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ‘প্রতিবেদনটি এখনও পূর্ণাঙ্গ হয়নি এবং পূর্ণাঙ্গ করতে আরও দুই চারদিন সময় লাগতে পারে।’
অভিযোগ আছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনাতেই আব্দুল হাকিমের নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ এক নেতা আব্দুল হাকিমকে কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করে এবং আব্দুল হাকিমের পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টেও জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ থাকায় সেই অভিযোগ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়।
এ বিষয়ে জানতে নিয়োগপ্রাপ্ত ইমাম আব্দুল হাকিমকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি ।
১ম কমিটির প্রতিবেদন আমলে না নিয়ে কেন ২য় কমিটি গঠন করা হলো এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার(ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রথম কমিটির রিপোর্ট তো ফর্মালি আমার কাছে জমা দেয়নি, উপাচার্যের কাছে জমা দিয়েছে কিনা আমার জানা নেই। দ্বিতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল আদালতে রিটের প্রেক্ষিতে, সেটা বাহিরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত হয়েছে যার কার্যক্রম এখনো চলমান।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ ১ম যে কমিটিটা করা হয়েছে সেটা ছিল ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি। সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কিন্তু কোনো সুপারিশ করেনি। পরবর্তী সময় হাইকোর্টে একজন প্রার্থী রিট করলে পরের কমিটিটি করা হয়েছে। ’



















