‘এজ অব চেইঞ্জ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভাবান স্থানীয় ১০ জন বক্তাদের মঞ্চায়নের মাধ্যমে আয়োজিত হয়েছে টেডএক্স জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বেলা ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ময়মনসিংহের ত্রিশালে নজরুল স্মৃতি জাদুঘর অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে স্থানীয়ভাবে আয়োজিত আন্তর্জাতিক টেডএক্স। টেডএক্স হলো এমন এক আন্তর্জাতিক মঞ্চ যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভাবান ব্যক্তিরা বক্তব্যর মাধ্যমে নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করেন।
২য় বারের মতো আয়োজিত এই মঞ্চে বক্তব্য দেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভাবান ১০ জন ব্যক্তি। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব, ফিল্ম ডিরেক্টর মেজবাউর রহমান সুমন, সিনেমাটোগ্রাফার জুবায়ের তালুকদার, প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ, ট্রাভেল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আরকে সোহান, লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মোহাইমিন পাটোয়ারী, ক্রিকেট বিশ্লেষক সাইদ আবিদ হাসান সামি, ফিল্ম মেকার আমিতাভ রেজা চৌধুরী, কার্টুনিস্ট সাইদ রাশেদ ইমাম হাসান তন্ময় এবং অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মান
মঞ্চে প্রথম বক্তা হিসেবে ট্রাভেল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আরকে সোহান নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত জনমানুষের জীবন ধারা নিয়ে কথা বলেন। ভ্রমণের ক্ষেত্রে শ্রোতাদের সচেতনতামূলক নানা পরামর্শ দেন। তার ক্যারিয়ার যাত্রার শুরুর প্রসঙ্গে বলেন, “গার্লফ্রেন্ড ছিলো, ছ্যাঁকা খাইছি; ট্রাভেল করা শুরু করছি, মন ফ্রেশ।”
স্থপতি ইকবাল হাবিব তার বক্তব্যে পরিবেশ সচেতনতা তুলে ধরেন। তিনি পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে কিভাবে স্থাপনা ও নগর তুলে উঠানো যায় তা উপস্থাপন করেন। তিনি উপস্থাপন করেন নদী এবং নারী একই রকম সত্ত্বা, নদীকে হত্যা করে নগরায়ন মানবজাতির জন্য হুমকি। এছাড়া তিনি এমন এক কাঠামো প্রদর্শন করেন যেখানে বৈদ্যুতিক যন্ত্র ছাড়াই অবকাঠামোতে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা যায়।
তিনি পরিবেশ রক্ষায় ৩টি টার্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, “চয়েস, রেস্পন্সিবলিটি, একশন”।
ফিল্ম ডিরেক্টর মেজবাউর রহমান সুমন তার বক্তব্যে তুলে ধরেন বহুদিন ধরে চলে আসা সিনেমার স্ট্রাকচার নিয়ে। তিনি মনে করেন মানুষের চিন্তাধারা তার নিজস্ব। সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে ইন্সটিটিউশনাল স্ট্রাকচারে সব সিনেমে প্রায় একই রকম ধাঁচে থাকে।
তিনি বলেন, “আমি যখন কাজ করতে আসলাম কিংবা আমার ইউনিভার্সিটি লাইফ, কলেজ, স্কুল যেটাই বলি আমার নিজেকে সবসময় মনে হতো যে আমি একটা কুয়োর ব্যাঙ। এটা তখন মনে হতো না, এখন এসে আমি এটাকে আর্টিকুলেট করলাম। যে এই কুয়োর ব্যাঙটা নিজে কিছু দেখে নাই, কিন্তু ওর একটা নিজস্ব দেখা আছে কুয়ার ভেতরে, যেটা আমরা কেউ দেখি নাই। সেটা শুধুমাত্র ওই ব্যাঙটাই দেখতে পাইছে।
এখন বিষয়টা হচ্ছে নিজের গল্পটা কী আসলে? নিজের গল্পটা হচ্ছে নিজের ভেতরে প্রত্যেকটা মানুষের একটা ডিফরেন্ট আইডিয়াজ আছে, একটা পারসপেক্টিভ আছে। ওইটা যদি দেখতে পাওয়া যায়, ওইটার খোঁজ যদি নিজে পেয়ে যেতে পারেন তাহলে ওটা একটা নতুন জিনিস। আর অন্যর কাছ থেকে খুঁজে নেওয়া, হাজার মানুষের কাছ থেকে পড়ে নেওয়া জিনিস আপনার না, ওটা অন্যর। তাই নিজেকে খোঁজাই হচ্ছে আমার কাছে মনে হয় শুধু আর্ট ফর্মে না, যেকোনো কিছুতেই প্রথমে নিজেকে খুঁজে নেওয়াই আসলে সবচেয়ে বড় ঘটনা এই জীবনে।”
সিনেমাটোগ্রাফার জুবায়ের তালুকদার তিনি দেখান বুয়েট থেকে পাশ করে কিভাবে শখ থেকে নিজের প্যাশনের দিকে ছুটে তার নিজের ক্যারিয়ার গড়েছেন। তিনি বক্তব্যে তার নিজের ক্যারিয়ার যাত্রা তুলে ধরেন।
তিনি প্যাশনকে ক্যারিয়ারে রূপান্তরে তিনটি দিক বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেন, “সময়, উন্নয়ন এবং উদযাপন। তিনি বলেন, প্যাশন ধরে রাখতে নিজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা। কখনো হতাশ হয়ে চক্রে আটকে থাকা যাবে না, নিজের অগ্রগতি বজায় রাখতে হবে। নানা জনের কথায় প্ররোচিত না হয়ে নিজের প্যাশনকে উদযাপন করতে হবে।”
প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের নানা পরামর্শ দেন। তিনি উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা কৌশল শিক্ষা দেন। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়মানুবর্তিতা, একাডেমিক ফলাফল, এক্সট্রা কারিকুলার এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের উপর গুরুত্ব দেন।
লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মোহাইমিন পাটোয়ারী তার লেখক হয়ে ওঠার বক্তব্য বলার মাধ্যমে শ্রোতাদের নিজেদের পছন্দের বিষয়ে দীর্ঘসময় পরিশ্রম করার মানসিকতার গুরুত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি তার ব্যক্তিগত জীবন থেকে দেখান কোন এক বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনে সে বিষয়ের প্রতি ফোকাসড হয়ে কাজ করার দক্ষতা।
ফিল্ম মেকার আমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, “সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে ৫টি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো- পড়, পড়, পড়, পড় এবং পড়। একটা লাইন পড় অথবা যে কোন কিছু।”
তিনি আরও বলেন, ”মানুষের সুন্দর সময় হলো শৈশব, বড় হলে বাস্তবতা বাড়ে, তখন মানুষ শৈশবে ফিরতে চায়। জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ব্যর্থতা, ব্যর্থতা বেদনার বিষয় না আনন্দের। ব্যর্থতার মধ্যেই সফলতা।”
কার্টুনিস্ট সাইদ রাশেদ ইমাম হাসান তন্ময় বলেন, “ছোটবেলায় আঁকা ছাড়া আমি কিছুই বুঝতাম না। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর ছবি আঁকাই ছিল আমার জীবন। হঠাৎ সাউথ এশিয়ার কার্টুন আকাঁর কম্পিটিশন হবে শুনতে পাই। আমি অংশ নিতে আমি ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমাকে দিয়ে হবে না। পরে একরাতে এক বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উন্মাদ অফিসে আমার যে বস ছিলো উনার কথা রাখতে ছবি একে জমা দেই।তিন মাস পর যখন শুনলাম আমি অ্যাওয়ার্ড জিতেছি, তখনই বুঝেছি—ভয় নয় , চেষ্টা করাটাই আসল।”
তিনি আরও বলেন, “নিজের ভেতরে খুঁজে বের করো সেই কাজটা, যেখানে মন বসে, যেখানে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারো। ইয়াং জেনারেশনকে বলবো ক্রিয়েটিভ কাজকে গুরুত্ব দাও। সৃষ্টিশীলতাই তোমারর ক্যারিয়ার গড়বে।”
অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মান তার বক্তব্যে তুলে ধরেন, আমি কখনো ভাবি নাই যে আমি কখনও অভিনয় করবো আমি সেটা করা শুরু করেছি। আমি শুরু থেকেই গুনি মানুষদের সাথে কাজ করার সুযোগ পাই এখনো করছি । প্রতিবারই মনে হয় আমি নতুন কিছু শিখছি ।
তিনি আরও বলেন, “আপনারা এক কেন্দ্রীক পড়াশুনা করছেন আমিও করেছি কিন্তু এর বাইরেও আপনাদের কিছু অভিজ্ঞতা আছে যা আপনাকে পরিবর্তন করে দিতে পারে । এইটা শুধু অপনাকে পরিবর্তন না, আপনার আশেপাশের মানুষকেও লাইট আপ করতে পারে। আপনি যদি মনে করেন, না আমাকে দিয়ে হবে না, আমি এমন করলে কেমন দেখাবে, মানুষ কি বলবে, এইটা চিন্তা করলে আপনার জীবনেও কিছু হবে না । আমার আসে পাশে অনেক ডিমোটিভেটর ছিল এখনও আছে, কিন্তু আমি সবসময় চিন্তা করি আমি কি চাই, ‘বি সেলফিশ’ নিজের জন্য কিছু করতে হবে তখন আস্তে আস্তে আপনার কাছে মানুষ আসা শুরু করবে । আপনি যত দিন না নিজেকে পরিবর্তন করবেন, আপনার আসে পাশের মানুষ এমনই থাকবে। আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি এই কাজটার জন্য যোগ্য।”
সবশেষে ক্রিকেট বিশ্লেষক সাইদ আবিদ হাসান সামি এক ভিডিও বার্তায় শ্রোতাদের উদ্দ্যেশ্য করে উপস্থিত না থাকার অপারগতা ব্যক্ত করে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরবর্তী কোন ইভেন্টে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে সকলের প্রতি শুভকামনা জানান।
ইভেন্ট প্রসঙ্গে টেডএক্স জাককানইবি-র লিড লাইসেন্সি আকতাব উদ্দিন সারোয়ার বলেন, “টানা দ্বিতীয়বারের মতো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে টেডএক্স ইভেন্ট আয়োজন করতে পেরে আমরা গর্বিত। এই আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সুযোগ খুঁজে পেয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। আজকের এই সফল আয়োজনের পেছনে রয়েছে আমাদের টানা ছয় থেকে সাত মাসের পরিশ্রম। এজন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।




















