গত শুক্রবার দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ফলে সর্বত্রই এখন আলোচনা—কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি এবং কে বসতে যাচ্ছেন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তির আসনে। ঘুরেফিরে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার নাম আলোচনায় আসলেও এ মুহূর্তে সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তিটি হলেন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সার্বিক সমীকরণে দল ও দলের বাইরে পছন্দের শীর্ষে রয়েছে তাঁর নাম।
সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও দূরদর্শিতা, দল ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব মির্জা ফখরুলকে এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। যে কারণে বিএনপিরও একটি বড় অংশ তাঁকে রাষ্ট্রপতি করার পক্ষে। এ ছাড়া সংকটকালে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একজন দক্ষ ও বিতর্কহীন রাষ্ট্রপতির গুরুত্ব অপরিসীম। সেই মানদণ্ডে বনেদি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুধু বিএনপিরই প্রথম পছন্দ নয়; বরং সাধারণ মানুষের কাছেও এক আস্থার নাম। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। তবে রাষ্ট্রপতির পদে আলোচনার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের কঠিন সময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য ও শান্ত রাজনৈতিক কৌশল দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক মহলে তাঁকে একটি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। এ ছাড়া দেশের ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর সমন্বয়ক ভূমিকা অনস্বীকার্য।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) তিনি পদত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার যৌক্তিকতা নিয়ে এখন সর্বমহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। মূলত তিনটি প্রধান কারণে তিনি এ আলোচনায় সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন। জানা গেছে, মির্জা ফখরুলের প্রত্যাশা ছিল—ফ্যাসিবাদী আমলে নির্যাতনের শিকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, বর্তমানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া। এসবের তিনটিই ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ অলংকারিক ও মর্যাদাপূর্ণ পদ ‘রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আসাটা সর্বমহলেই প্রত্যাশিত। এর পেছনে মূলত তাঁর রাজনৈতিক ত্যাগ, পরিচ্ছন্ন ইমেজ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপিতে বিশ্বস্ততা ও দুঃসময়ের কাণ্ডারি হিসেবে মির্জা ফখরুল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন ‘সাদামাটা ও সজ্জন’ রাজনীতিক হিসেবে সমধিক পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ আজ পর্যন্ত মেলেনি। শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক বিতর্কে শালীনতা বজায় রাখা এবং মার্জিত আচরণের জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছেও সমানভাবে শ্রদ্ধেয়। বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে বিএনপির চরম দুঃসময়ে সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি এবং বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রবাসে থাকা অবস্থায় অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। শত শত মামলা, হামলা ও কারাবরণ সত্ত্বেও জিয়া পরিবারের প্রতি তাঁর অবিচল আনুগত্য এবং সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা তাঁকে নেতাকর্মীদের কাছে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে মির্জা ফখরুলের রয়েছে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। যেহেতু রাষ্ট্রপতি পদটি কোনো একক দলের নয়, বরং তা রাষ্ট্রের, সেহেতু তিনি তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় প্রমাণ করেছেন যে তিনি উগ্রবাদের বিরোধী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা এবং সুশীল সমাজের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক তাঁকে একজন গার্ডিয়ান ফিগার হিসেবে উপস্থাপন করে। আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক মহলেও তাঁর আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য বৈশ্বিক সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
১৯ ৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রয়েছে বর্ণাঢ্য পারিবারিক ইতিহাস। তাঁর বাবা মরহুম রুহুল আমিন (চখা মিয়া) ছিলেন কৃষি প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বড় চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রী এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।
দেশের বর্ষীয়ান নেতা ৭৯ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল একজন সাবেক শিক্ষক এবং অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধীরস্থির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে অভিভাবকত্বের আসনে বসানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত করে তুলেছে। মির্জা ফখরুল ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে এইচএম এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর এসএ বারী পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে তিনি ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরবর্তীকালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি নতুন সরকার গঠন করায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চাইবে এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করতে, যিনি রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে শক্ত হাতে হাল ধরতে পারবেন এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন। মির্জা ফখরুল যেহেতু নিজে এবার নির্বাচন করে রাজনীতি থেকে অবসরের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তাই তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করাটা হবে তাঁর দীর্ঘ ত্যাগের একটি যথাযোগ্য সম্মান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম বলেন, অতীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। সেই বিবেচনায় বিএনপির উচিত হবে এমন লোককে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা, যিনি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য এবং আনুগত্যশীল ও প্রাজ্ঞ। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিজেই বাছাই করতে হবে, কারণ দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি নেতাদের অবদান প্রত্যক্ষ করেছেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতিকে সৎ, দক্ষ ও সাহসী হতে হবে, যাতে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বলেন, বিএনপিতে যোগ্য বেশ কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতা আছেন, তবে শারীরিক সক্ষমতা ও সংকটকালে প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন—এমন কাউকেই রাষ্ট্রপতি পদের জন্য যোগ্য মনে করি। এ ক্ষেত্রে বিএনপি মহাসচিব যোগ্যতম।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক জানান, রাষ্ট্রপতি পদে এমন এক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা উচিত যিনি প্রাজ্ঞ, সৎ, নিরপেক্ষ এবং যাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো অভিযোগ নেই।
এদিকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার জন্য ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনসহ অন্য কমিশনাররা। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের দপ্তরে এ সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করে স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হবে।
সূত্রঃ কালবেলা






























