বাংলাদেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় একটি অংশ সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর নষ্ট হয়ে যায়, যা দেশের কৃষি খাতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কিছুটা বেশি হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক সংরক্ষণের ঘাটতির কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই অপচয়ের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আর্থিক সহায়তায় শুরু হওয়া এই গবেষণাটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক এবং ফলাফল বিশ্লেষণ করার চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে।
গবেষণা দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের পরিচালক এবং কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী, যার সঙ্গে কাজ করছেন কয়েকজন তরুণ শিক্ষার্থী ও সহকারী গবেষক। এই বিশেষ প্রযুক্তির মূল কাজ হলো সংরক্ষণাগারের ভেତরে তাপমাত্রা এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং পরিবেশের যেকোনো পরিবর্তনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া। সংরক্ষিত পেঁয়াজের স্তূপে বিশেষ সেন্সর যুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে এবং ভেতরের পরিবেশের তারতম্য বুঝ Iর সাথে সাথে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা বা এয়ারফ্লো নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে পচন রোধ করার পাশাপাশি পেঁয়াজের স্বাভাবিক ওজন হ্রাস পাওয়ার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে বার্ষিক চাহিদার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হওয়া সত্ত্বেও উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে বিভিন্ন সময়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। গবেষকরা জানিয়েছেন যে পরীক্ষামূলক ফলাফলে এই আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংরক্ষণকালীন অপচয় প্রায় পনেরো থেকে ষোলো শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব বলে দেখা গেছে। এই পদ্ধতি সফল হলে কৃষকরা ফসল তোলার পরপরই কম দামে তা বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না, বরং নিজেদের সংরক্ষাগারে রেখে বাজারের অনুকূল পরিস্থিতি বুঝে লাভজনক দামে বিক্রি করতে পারবেন।
গবেষণার বর্তমান পর্যায় নিয়ে প্রধান গবেষক ড. রোস্তম আলী জানিয়েছেন যে তারা কেবল ফলন বাড়ানোর পরিবর্তে পরবর্তী অপচয় রোধ ও কৃষকদের ন্যায্য আর্থিক লাভ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই পাইলট মডেলটি মাঠপর্যায়ে এবং বাণিজ্যিক সংরক্ষণাগারে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বৃহত্তর পরিসরে এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ করা গেলে দেশের পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করা এবং কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া আরও সহজতর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।





































