সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসინাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ঢাকা সরকারের পক্ষ থেকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি বারবার জোরালো করা হলেও নয়াদিল্লি এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। গত আগস্টের শেষ দিকে দিল্লিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাটি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। পলাতক ও দণ্ডিত একজন নেত্রীকে ভারতীয় ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য করার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
তবে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার নানা ইতিবাচক বার্তা দিয়ে চলেছে ভারত। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার যে অনুষ্ঠানটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল এবং এর সঙ্গে ভারতীয় সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকরা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত মতামতকে ভারত সরকার কোনোভাবেই সমর্থন করে না। ফলে একদিকে প্রত্যর্পণ ইস্যুতে নীরবতা বজায় থাকলেও, অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে মৈত্রীপূর্ণ ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে আন্তরিকতা প্রকাশ করছে নরেন্দ্র মোদী প্রশাসন।
দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে ভারতের নীতিনির্ধারকরা পারস্পরিক স্বার্থ, কৌশলগত সহযোগিতা এবং ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন। সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ফোরামে জানানো হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ এবং সামরিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোতে অংশীদারিত্ব আরও দৃঢ় করতে আগ্রহী। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে স্বাগত জানানোর জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় অভ্যর্থনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও তার এই সম্ভাব্য সফরের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবুও এই সফরকে দুই দেশের বরফ গলা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ব্রিকস সম্মেলনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমেও নিজেদের বন্ধুত্বের প্রমাণ দিচ্ছে ভারত। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ও অন্যান্য কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতে, আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ দুই দেশের নেতৃবৃন্দের যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করবে। তা সত্ত্বেও, দণ্ডিত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত জটিলতা এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক অস্বস্তির এই দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্য দিয়েই বর্তমানে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্ক এগোচ্ছে।



































