অর্থনীতি ডেস্ক: কয়েক বছর আগেও ঠাকুরগাঁও শহরের বিভিন্ন জুয়েলারি কারখানায় ব্যস্ত সময় পার করতেন ছয় থেকে সাত শ সোনার কারিগর। কিন্তু নানা সংকটের আবর্তে পড়ে সেই পেশাদার কারিগরের সংখ্যা এখন মাত্র দুই থেকে আড়াই শ জনে নেমে এসেছে। কাজের চরম আকাল দেখা দেওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেকে এই পৈত্রিক বা দীর্ঘদিনের পেশা ছেড়ে অটোরিকশা চালানো, রাজমিস্ত্রির জোগালি কিংবা সবজি বিক্রির মতো ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন। স্থানীয় স্বর্ণশিল্পী শ্রমিক ইউনিয়ন ও ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেডিক এই মন্দার কারণে জেলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কারিগর এখন বেকারত্ব ও মানবেতর জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন।
এই বিপর্যয়ের পেছনে মূলত সোনার লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী দাম, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং বিদেশি রেডিমেড গয়নার আগ্রাসনকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাজারে এখন ভারত বা মধ্যপ্রাচ্যের তৈরি আকর্ষণীয় ডিজাইনের ২২ ক্যারেটের গয়না সহজে পাওয়ায় স্থানীয়ভাবে অর্ডার দিয়ে গয়না বানানোর চল প্রায় উঠে গেছে। ক্রেতারাও দীর্ঘ সাত থেকে দশ দিন অপেক্ষা না করে দোকান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে রেডিমেড গয়না কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তা ছাড়া, আমদানিকৃত এসব গয়না নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দ্রুত তৈরি হলেও ছোট কারিগরদের কুটিরশিল্পের মতো কারখানায় বিশ থেকে ত্রিশ লাখ টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক মেশিন কেনার কোনো আর্থিক সামর্থ্য নেই।
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত কাজ না থাকায় অনেক অভিজ্ঞ কারিগরের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি হাতের অমূল্য যন্ত্রপাতিতেও জং ধরে গেছে বলে জানা গেছে। অনেক কারিগর দৈনিক মাত্র পাঁচ থেকে সাত শ টাকা আয় করে বর্তমান বাজারে সংসার চালাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে কাজের টেবিল, ড্রয়ার বা আসবাবপত্র বিক্রি করে দেনাদার হয়ে পড়ার নজিরও রয়েছে। চরম অনিশ্চয়তা ও কম আয়ের কারণে নতুন প্রজন্মের তরুণরাও এখন আর এই ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত পেশায় আসতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন না।
পরিবেশকদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে হলমার্ক বা কেডিএম প্রযুক্তিতে মানসম্মত গয়না তৈরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিদেশি গয়না আমদানিতে বেশি আগ্রহী বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কারিগরদের অবিলম্বে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত না করলে এবং বিদেশি গয়নার ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা না কমালে ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প চিরতরে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


































