জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘পাখির স্বর্গ’ বলা হয়। প্রতিবছর শীতের শুরুতেই হাজারো অতিথি পাখির আগমনে মুখর হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক ও জলাভূমিগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই আগমন ক্রমেই কমে আসছে। কেন কমছে অতিথি পাখি সে বিষয়ে কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম প্রান্তিক। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক রেদওয়ান আহাম্মেদ সাগর।
প্রশ্ন: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি আসলেও এখন হ্রাস পাওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?
অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম: বাংলাদেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাহাঙ্গীরনগরেও গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে অবকাঠামো উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন আবাসিক ও একাডেমিক ভবন নির্মাণ অপরিহার্য হলেও এসব উন্নয়ন কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মহাপরিকল্পনা অনুসরণ করছে না।
প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সুন্দর পরিবেশভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান ছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে এর সঠিক বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের জলাভূমি সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশন (Ramsar Convention) অনুসরণ করেও আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক জলাভূমি ও সৌন্দর্য রক্ষা করতে পারছি না। রাজনৈতিক প্রভাব ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
এর ফলে অতিথি পাখিদের আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তাদের আগমন হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ। শুধু মানুষের কোলাহল নয়, বরং লেকে আক্রমণাত্মক প্রজাতির বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান থেকে তৈরি হওয়া টক্সিনও পাখিদের জন্য ক্ষতিকর। এই টক্সিনযুক্ত পরিবেশে তারা স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারে না।
প্রশ্নঃ অতিথি পাখির সংখ্যা হ্রাসের আরও কী কী কারণ আপনি দেখছেন?
অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম: অতিথি পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত জনসমাগম ও আন্তর্জাতিক বায়ুদূষণ বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলো যেমন ভারত ও চীনের শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত দূষিত বায়ু আমাদের আকাশেও প্রভাব ফেলছে।
এই দূষণের কারণে পাখিদের উড়াল পথে দৃশ্যমানতা কমে যায়, ফলে তাদের জন্য নিরাপদে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে শীতকালে ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের ভিড় ও কোলাহল পাখিদের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তারতম্যও তাদের প্রজনন ও বিশ্রামের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট করছে।
প্রশ্নঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকায় পাখি শিকারের অভিযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে করণীয় কী হতে পারে?
অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম: আমরা প্রস্তাব দিবো বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন, মনপুরা ও সংলগ্ন এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হোক।
এখানে শুধুমাত্র গবেষণা ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশের অনুমতি থাকবে। বহিরাগতদের প্রবেশ সীমিত করা প্রয়োজন, যাতে পাখিদের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বজায় থাকে।
এছাড়া ওই এলাকাকে ঘিরে একটি ‘নেচোরাল বা স্পোশাল জোন’ তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কেউ নির্দিষ্ট দূরত্বের বেশি যেতে পারবে না। এতে পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হবে।
প্রশ্নঃ অতিথি পাখি সংরক্ষণ ও সচেতনতায় গবেষকরা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন?
অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম: অতিথি পাখি সংরক্ষণে গবেষণার ক্ষেত্রটি আরও বিস্তৃত করতে হবে। এ খাতে পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ দেওয়া জরুরি।
অতিথি পাখিদের পরাগায়নে প্রবাহিত জীবাণু, কিংবা পাখির সাথে নিয়ে আসা ভাইরাস জনিত সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও আমাদের গবেষণা দরকার। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ দুই দিকেই এর প্রভাব পড়ে।
গবেষণার মাধ্যমে আমরা যদি পাখিদের আগমন, অবস্থান ও প্রজনন-চক্র নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করতে পারি, তবে তা ভবিষ্যতের সংরক্ষণ নীতিমালায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
প্রশ্নঃ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা কীভাবে তৈরি করা যেতে পারে?
অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম: গবেষণার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণায় অংশ নেয়, যা বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান তৈরি করে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা একদিকে গবেষণার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করবে, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষায় নিজেরাই হয়ে উঠবে নেতৃত্বদাতা।
আমি সবসময় বলি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের সবচেয়ে মেধাবী তরুণ প্রজন্মের অংশ। তাদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে তারা শুধু প্রকৃতি নয়, দেশের ভবিষ্যৎকেও রক্ষা করতে পারবে।





















