ঢাকা ১১:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ
Logo জাবিস্থ মাদারীপুর জেলা ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে রিমন-জাহিদ Logo ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারির দাবিতে সোমবার শিক্ষার্থীদের গণজমায়েত Logo র‌্যাব-১০ এর অভিযানে ৫০ বোতল ফেনসিডিলসহ নারী মাদক ব্যবসায়ী আটক Logo জাবিতে ‘তারুণ্যের চোখে আগামী নির্বাচন ও গণভোট’ শীর্ষক সেমিনার Logo শুধু নিয়ন্ত্রন নয়, ওষুধ ছাড়াই প্রাকৃতিক উপায় ডায়াবেটিস নিরাময় সম্ভব  Logo নির্বাচনকালীন গুজব ও অপপ্রচার মোকাবেলায় সাংবাদিকদের পিআইবির প্রশিক্ষণ Logo ইউনিলিভার, যুক্তরাজ্য সরকার ও ইওয়াই-এর যৌথ উদ্যোগের দশ বছর পূর্তি উদযাপন Logo ‎কুবিতে আদিবাসী ছাত্র সংসদের নবীনবরণ ও প্রবীণ বিদায় Logo ‎কুবিতে ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল  Logo চার বছর পর হাবিপ্রবিতে ইভিনিং এমবিএ প্রোগ্রামের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত

২ হাজার কোটি টাকা পাচারের আসামি লৌহজংয়ের বিএনপি নেতা অপুর মাফিয়ারাজ্য

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনকে তছনছ করা দুর্নীতিবাজদের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান ওরফে অপু চাকলাদারের নাম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ছয়টি মানিলন্ডারিং মামলায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এই নেতা অস্ত্র, প্রতারণা ও সাইবার অপরাধসহ মোট ২৭টি মামলার আসামি। তবুও বছরের পর বছর তিনি আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অপুর বিরুদ্ধে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। বর্তমানে তিনি লৌহজং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব এবং আসন্ন কমিটিতে সভাপতি হওয়ার লক্ষ্যে সক্রিয় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কাস্টমস লুটের ভয়াবহ চিত্র

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’-এ অন্তত তিন হাজার ৬৬১ থেকে তিন হাজার ৭৭৭ বার অবৈধভাবে প্রবেশ করে শত শত কনটেইনার খালাস করা হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এই জালিয়াতি সংঘটিত হয়।

এই অপরাধচক্রের মূল হোতা হিসেবে অনুসন্ধানে উঠে আসে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অপুর মালিকানাধীন ‘মেসার্স চাকলাদার সার্ভিস’-এর নাম। পাশাপাশি ‘মেসার্স এম আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’-এর নামে বোতাম ও সেফটিপিন আমদানির এলসি খুলে গোপনে বেনসন ব্র্যান্ডের সিগারেট আমদানি করে শত শত কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়। এই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক অপু ও তাঁর ছোট ভাই মিজানুর রহমান দীপু চাকলাদার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক দুই কর্মকর্তার ইউজার আইডি ব্যবহার করে বারবার স্বয়ংক্রিয় খালাস ব্যবস্থায় ঢুকে সরকারি বিধি-বিধান উপেক্ষা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুয়া অনুমতিপত্র ব্যবহার করে পণ্য খালাসের অভিযোগও রয়েছে। সূত্র জানায়, এই অপরাধ সংঘটনে একজন প্রভাবশালী শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদ ছিল, যিনি শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।

রাজনৈতিক দ্বিমুখিতা, দুর্নীতির একক জোট

অপু চাকলাদার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও তাঁর ছোট ভাই দীপু চাকলাদার আওয়ামী লীগের নেতা। রাজনৈতিক দল ভিন্ন হলেও দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক অভিন্ন। অভিযোগ রয়েছে, শেখ পরিবারের পরিচয় ও ক্ষমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায় তারা গড়ে তোলে একটি শক্তিশালী ‘মাফিয়ারাজ্য’।

সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই দুই ভাই বর্তমানে ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি এবং দেশ-বিদেশে বিপুল বিনিয়োগের মালিক। গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদকের অনুসন্ধানে তাঁদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য মিলেছে।

আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোল

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অপু চাকলাদারের জামিন করাতে গিয়ে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি বিচারক নূরে আলমের আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলে অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান দীপুর নেতৃত্বে একদল আইনজীবী এজলাসে হট্টগোল করেন, বিচারককে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন এবং আদালত ত্যাগে চাপ দেন। এ ঘটনায় বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বিচারকের পক্ষে পাল্টা বিবৃতি দেয়।

পলাতক ভাই, প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা

জুলাই গণহত্যা মামলার আসামি দীপু চাকলাদার বর্তমানে পলাতক। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে গোপনে আশ্রয় দিচ্ছেন অপু চাকলাদার। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, দুই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দুদক এখনো অপুর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লৌহজং উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, আওয়ামী-ঘনিষ্ঠ ও দুর্নীতিবাজ একজন ব্যক্তির হাতে উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব গেলে দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। নতুন প্রজন্ম দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে।

অভিযুক্তের বক্তব্য ও দুদকের নীরবতা

এর আগে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে অপু চাকলাদার দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা সব মামলা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলের ষড়যন্ত্র। তবে সর্বশেষ এই প্রতিবেদন তৈরির সময় একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোনেও কোনো সাড়া মেলেনি।

জনপ্রিয়

জাবিস্থ মাদারীপুর জেলা ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে রিমন-জাহিদ

২ হাজার কোটি টাকা পাচারের আসামি লৌহজংয়ের বিএনপি নেতা অপুর মাফিয়ারাজ্য

প্রকাশিত ১২:১৮:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনকে তছনছ করা দুর্নীতিবাজদের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান ওরফে অপু চাকলাদারের নাম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ছয়টি মানিলন্ডারিং মামলায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এই নেতা অস্ত্র, প্রতারণা ও সাইবার অপরাধসহ মোট ২৭টি মামলার আসামি। তবুও বছরের পর বছর তিনি আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অপুর বিরুদ্ধে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। বর্তমানে তিনি লৌহজং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব এবং আসন্ন কমিটিতে সভাপতি হওয়ার লক্ষ্যে সক্রিয় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কাস্টমস লুটের ভয়াবহ চিত্র

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’-এ অন্তত তিন হাজার ৬৬১ থেকে তিন হাজার ৭৭৭ বার অবৈধভাবে প্রবেশ করে শত শত কনটেইনার খালাস করা হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এই জালিয়াতি সংঘটিত হয়।

এই অপরাধচক্রের মূল হোতা হিসেবে অনুসন্ধানে উঠে আসে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অপুর মালিকানাধীন ‘মেসার্স চাকলাদার সার্ভিস’-এর নাম। পাশাপাশি ‘মেসার্স এম আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’-এর নামে বোতাম ও সেফটিপিন আমদানির এলসি খুলে গোপনে বেনসন ব্র্যান্ডের সিগারেট আমদানি করে শত শত কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়। এই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক অপু ও তাঁর ছোট ভাই মিজানুর রহমান দীপু চাকলাদার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক দুই কর্মকর্তার ইউজার আইডি ব্যবহার করে বারবার স্বয়ংক্রিয় খালাস ব্যবস্থায় ঢুকে সরকারি বিধি-বিধান উপেক্ষা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুয়া অনুমতিপত্র ব্যবহার করে পণ্য খালাসের অভিযোগও রয়েছে। সূত্র জানায়, এই অপরাধ সংঘটনে একজন প্রভাবশালী শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদ ছিল, যিনি শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।

রাজনৈতিক দ্বিমুখিতা, দুর্নীতির একক জোট

অপু চাকলাদার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও তাঁর ছোট ভাই দীপু চাকলাদার আওয়ামী লীগের নেতা। রাজনৈতিক দল ভিন্ন হলেও দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক অভিন্ন। অভিযোগ রয়েছে, শেখ পরিবারের পরিচয় ও ক্ষমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায় তারা গড়ে তোলে একটি শক্তিশালী ‘মাফিয়ারাজ্য’।

সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই দুই ভাই বর্তমানে ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি এবং দেশ-বিদেশে বিপুল বিনিয়োগের মালিক। গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদকের অনুসন্ধানে তাঁদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য মিলেছে।

আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোল

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অপু চাকলাদারের জামিন করাতে গিয়ে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি বিচারক নূরে আলমের আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলে অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান দীপুর নেতৃত্বে একদল আইনজীবী এজলাসে হট্টগোল করেন, বিচারককে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন এবং আদালত ত্যাগে চাপ দেন। এ ঘটনায় বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বিচারকের পক্ষে পাল্টা বিবৃতি দেয়।

পলাতক ভাই, প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা

জুলাই গণহত্যা মামলার আসামি দীপু চাকলাদার বর্তমানে পলাতক। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে গোপনে আশ্রয় দিচ্ছেন অপু চাকলাদার। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, দুই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দুদক এখনো অপুর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লৌহজং উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, আওয়ামী-ঘনিষ্ঠ ও দুর্নীতিবাজ একজন ব্যক্তির হাতে উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব গেলে দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। নতুন প্রজন্ম দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে।

অভিযুক্তের বক্তব্য ও দুদকের নীরবতা

এর আগে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে অপু চাকলাদার দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা সব মামলা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলের ষড়যন্ত্র। তবে সর্বশেষ এই প্রতিবেদন তৈরির সময় একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোনেও কোনো সাড়া মেলেনি।