ময়মনসিংহের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর পৌরসভা তার প্রতিষ্ঠার প্রায় এক শতাব্দী পূর্ণ করার পথে রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি ‘ক’ শ্রেণির এই পৌরসভাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। উত্তর-পূর্ব বাংলার জমিদারী ঐতিহ্য, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির এক বর্ণাঢ্য দলিল হিসেবে এই জনপদের রয়েছে দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, সে সময় এই অঞ্চলের ১২টি জমিদারবাড়ির মধ্যে গৌরীপুর রাজবাড়ি এস্টেটের উদ্যোগে প্রথম এখানে পৌরসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অঞ্চলটির বিভিন্ন জমিদারদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অনৈক্যের কারণে অন্যান্য এস্টেটের পৌরসভা গড়ার প্রাথমিক উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হলেও শেষ পর্যন্ত গৌরীপুর এস্টেটেই এই প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের পত্তন ঘটে।
এই পৌরসভার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের পেছনে এককালের খরস্রোতা বালুয়া নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ঐতিহাসিক মানচিত্র ও বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বালুয়া নদী গৌরীপুর নগরাঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, জনবসতি এবং বাণিজ্য প্রসারে বড় ধরনের অবদান রেখেছিল। নদীটি অতীতে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন এস্টেটের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো এবং পরবর্তীতে ভালকি নদীর সঙ্গে মিলিত হতো। সময়ের বিবর্তনে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে সেই নদী আজ তার স্রোত হারিয়ে ফেলেছে এবং এর জায়গায় কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন খাল, বিল ও নিচু ভূমি অবশিষ্ট রয়েছে। নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা থেকে আধুনিক নগরে রূপান্তরিত হওয়ার এই পরিক্রমা গৌরীপুরের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ডাকঘর, টেলিগ্রাফ, আদালত এবং পৌরসভা ছিল কোনো এলাকার গুরুত্ব নির্ধারণের প্রধান মাপকাঠি। ঐতিহাসিক শ্রীকেদারনাথ মজুমদারের লেখা থেকে জানা যায়, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বৃহত্তর ময়মনসিংহের কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে ডাক ও টেলিগ্রাফ সেবা চালু ছিল, যার মধ্যে গৌরীপুর অন্যতম একটি কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে গৌরীপুর জংশন রেলওয়ে স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখানকার যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটে। এই রেললাইনের কল্যাণে গৌরীপুর একটি প্রধান বাণিজ্যিক ও যোগাযোগকেন্দ্রে পরিণত হয়, যার ফলে এর পরিধি ও গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সমমর্যাদাসম্পন্ন অন্যান্য জমিদারী এলাকা যেমন রামগোপালপুর কেবল একটি ইউনিয়নে সীমাবদ্ধ থাকলেও, রেল যোগাযোগের সুবাদেই গৌরীপুর একটি পূর্ণাঙ্গ শহর হিসেবে দ্রুত বিকাশ লাভ করে।
এদিকে গৌরীপুর নামকরণের উৎপত্তি নিয়ে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মতপার্থক্য ও রহস্য রয়ে গেছে। প্রচলিত কিছু সূত্রে জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর কন্যা ‘গৌরী’ বা দেবী গৌরীর নামানুসারে এ অঞ্চলের নামকরণের কথা বলা হলেও, ঐতিহাসিক বংশলতিকায় এর পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে গবেষকদের একাংশের মতে, ১৭৭০ সালের দিকে যুগলকিশোর রায় চৌধুরী বালুয়া নদীর তীরে গৌরীপুর এস্টেট প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়। এই অজানা ইতিহাস উন্মোচনে স্থানীয় বিভিন্ন গবেষক ও সংগঠন প্রাচীন দলিল, মানচিত্র এবং ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক প্রতিবেদন নিয়ে নানা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। শতবর্ষের এই ঐতিহ্যবাহী পৌরসভাটি তাই কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলার ঔপনিবেশিক ও জনপদ গঠনের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।






































