ঢাকা ০৩:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হুথির হাতে পেরিম দ্বীপ, বন্ধ হবে লোহিত সাগরও?

ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলের সম্পূর্ণ অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জোরালো দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। সম্প্রতি তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে, যার মধ্যে কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আগে বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের অন্যতম প্রধান বন্দরনগরী মোখা দখল করেছিল, যা তাদের সামরিক অবস্থানকে আরও বেশি শক্তিশালী করেছে। এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পটভূমিতে এই ধরনের দ্রুত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বাব আল-মান্দেব প্রণালী এক অবিশ্বাস্য রকমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথটি মূলত লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের সঙ্গে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় বারো শতাংশ পণ্য প্রতিদিন এই সংবেদনশীল নৌপথ ব্যবহার করে চলাচল করে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন সময় ভূরাজনৈতিক সংকট এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এই বিকল্প সামুদ্রিক পথটির গুরুত্ব বিশ্ব অর্থনীতিতে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের ওপর অনেক বেশি ঝুঁকছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে তেল সরাসরি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পরিবাহিত হয়ে থাকে, যা পারস্য উপসাগর এড়িয়ে তেল রপ্তানি নিশ্চিত করে। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এই পাইপলাইনের দৈনিক তেল পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি বিশাল অংশ এখন এই বাব আল-মান্দেব প্রণালীর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে পুরো লোহিত সাগর শারীরিকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা কঠিন হলেও তাদের বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র এই নৌপথ দিয়ে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—এমন বার্তা দিতে পারলেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হতে পারে। ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বের বড় বড় জাহাজ কোম্পানি এবং বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এই পথ এড়িয়ে বিকল্প রুট বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ব্যয়, বিমা খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিদ্রোহীদের এই ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। মোখাসহ হুথি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থান লক্ষ্য করে এসব সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা পুরোপুরি থামাতে পারেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান এই ধমনী সুরক্ষিত রাখতে বৈশ্বিক শক্তিগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং আঞ্চলিক সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

জনপ্রিয়

একজনকে বাঁচাতে নেমে নিখোঁজ চার, ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার

হুথির হাতে পেরিম দ্বীপ, বন্ধ হবে লোহিত সাগরও?

প্রকাশিত ০১:১৬:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলের সম্পূর্ণ অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জোরালো দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। সম্প্রতি তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে, যার মধ্যে কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আগে বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের অন্যতম প্রধান বন্দরনগরী মোখা দখল করেছিল, যা তাদের সামরিক অবস্থানকে আরও বেশি শক্তিশালী করেছে। এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পটভূমিতে এই ধরনের দ্রুত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বাব আল-মান্দেব প্রণালী এক অবিশ্বাস্য রকমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথটি মূলত লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের সঙ্গে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় বারো শতাংশ পণ্য প্রতিদিন এই সংবেদনশীল নৌপথ ব্যবহার করে চলাচল করে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন সময় ভূরাজনৈতিক সংকট এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এই বিকল্প সামুদ্রিক পথটির গুরুত্ব বিশ্ব অর্থনীতিতে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের ওপর অনেক বেশি ঝুঁকছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে তেল সরাসরি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পরিবাহিত হয়ে থাকে, যা পারস্য উপসাগর এড়িয়ে তেল রপ্তানি নিশ্চিত করে। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এই পাইপলাইনের দৈনিক তেল পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি বিশাল অংশ এখন এই বাব আল-মান্দেব প্রণালীর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে পুরো লোহিত সাগর শারীরিকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা কঠিন হলেও তাদের বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র এই নৌপথ দিয়ে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—এমন বার্তা দিতে পারলেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হতে পারে। ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বের বড় বড় জাহাজ কোম্পানি এবং বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এই পথ এড়িয়ে বিকল্প রুট বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ব্যয়, বিমা খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিদ্রোহীদের এই ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। মোখাসহ হুথি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থান লক্ষ্য করে এসব সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা পুরোপুরি থামাতে পারেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান এই ধমনী সুরক্ষিত রাখতে বৈশ্বিক শক্তিগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং আঞ্চলিক সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।