ঢাকা ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

পাকিস্তানের রাজনীতিতে দমন-পীড়ন অস্থিরতা

দেশের অভ্যন্তরীণ চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা আড়াল করতে পাকিস্তানের বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় থাকলেও দেশের ভেতরকার পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। মূলত বৈশ্বিক ভাবমূর্তি রক্ষার এই অন্ধ দৌড় দেশটির সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা পুরোপুরি বিনষ্ট করে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতি যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তখন জনকল্যাণের কথা চিন্তা না করে কেবল বাহ্যিক কূটনীতির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এক মারাত্মক হঠকারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বর্তমানে এক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা জেঁকে বসেছে, যেখানে পর্দার আড়ালে সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান মুসলিম লিগ ও পিপিপির যৌথ জোট সরকারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব, যা দেশটির গণতান্ত্রিক ধারাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এর ফলে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে এবং দেশের অখণ্ডতা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতীতেও সামরিক শাসন বা অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের কারণে পাকিস্তানকে বড় ধরনের ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল, যা বর্তমান প্রশাসনের কার্যকলাপে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে নিয়মিত সন্ত্রাসী হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা অভিযানের কারণে পুরো দেশ এক রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবং আত্মঘাতী হামলায় বহু সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন গোষ্ঠী ও উগ্রপন্থীদের উপদ্রব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে। এই ভয়ংকর নিরাপত্তা সংকটের মধ্যেই সরকার প্রকৃত সমস্যা মোকাবিলা করার পরিবর্তে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দমনে সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইয়ের নেতাকর্মীদের ওপর দমনপীড়নের মাত্রা সম্প্রতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারাবন্দি নেতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত কর্মসূচি ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক গণগ্রেপ্তার ও তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি নারী নেতাকর্মী এবং শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সংসদ সদস্যদের পর্যন্ত প্রশাসনিক হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। সরকারের এই কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো বাধ্য হয়ে স্থগিত করতে হয়েছে।

সব মিলিয়ে, একাধারে লাগামহীন সন্ত্রাসবাদ দমন এবং অন্যদিকে রাজপথে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে কঠোর হাতে দমন করার এই দ্বিমুখী নীতি শাহবাজ শরিফ সরকারকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ চরম দুরবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া কেবল দমনমূলক উপায়ে এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণ পাকিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

জনপ্রিয়

জীবনের প্রাপ্তি নিয়ে কোনো হিসাব-নিকাশ করার প্রয়োজন বোধ করি না

পাকিস্তানের রাজনীতিতে দমন-পীড়ন অস্থিরতা

প্রকাশিত ০৮:৩০:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

দেশের অভ্যন্তরীণ চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা আড়াল করতে পাকিস্তানের বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় থাকলেও দেশের ভেতরকার পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। মূলত বৈশ্বিক ভাবমূর্তি রক্ষার এই অন্ধ দৌড় দেশটির সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা পুরোপুরি বিনষ্ট করে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতি যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তখন জনকল্যাণের কথা চিন্তা না করে কেবল বাহ্যিক কূটনীতির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এক মারাত্মক হঠকারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বর্তমানে এক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা জেঁকে বসেছে, যেখানে পর্দার আড়ালে সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান মুসলিম লিগ ও পিপিপির যৌথ জোট সরকারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব, যা দেশটির গণতান্ত্রিক ধারাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এর ফলে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে এবং দেশের অখণ্ডতা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতীতেও সামরিক শাসন বা অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের কারণে পাকিস্তানকে বড় ধরনের ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল, যা বর্তমান প্রশাসনের কার্যকলাপে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে নিয়মিত সন্ত্রাসী হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা অভিযানের কারণে পুরো দেশ এক রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবং আত্মঘাতী হামলায় বহু সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন গোষ্ঠী ও উগ্রপন্থীদের উপদ্রব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে। এই ভয়ংকর নিরাপত্তা সংকটের মধ্যেই সরকার প্রকৃত সমস্যা মোকাবিলা করার পরিবর্তে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দমনে সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইয়ের নেতাকর্মীদের ওপর দমনপীড়নের মাত্রা সম্প্রতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারাবন্দি নেতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত কর্মসূচি ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক গণগ্রেপ্তার ও তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি নারী নেতাকর্মী এবং শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সংসদ সদস্যদের পর্যন্ত প্রশাসনিক হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। সরকারের এই কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো বাধ্য হয়ে স্থগিত করতে হয়েছে।

সব মিলিয়ে, একাধারে লাগামহীন সন্ত্রাসবাদ দমন এবং অন্যদিকে রাজপথে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে কঠোর হাতে দমন করার এই দ্বিমুখী নীতি শাহবাজ শরিফ সরকারকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ চরম দুরবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া কেবল দমনমূলক উপায়ে এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণ পাকিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।