২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উন্মাদোনা এখনো রয়ে গেছে। স্পেনের সাফল্যের গল্পে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস বা ফ্যাবিয়ান রুইজ। তবে ট্রফি জয়ের উল্লাসে আরেকজন ফুটবলারের গল্প কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তিনি ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়া।
সম্প্রতি তিনি ইংলিশ ক্লাব চেলসি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছেন। আগামী মৌসুম থেকে স্প্যানিশ এই ক্লাবটির হয়ে খেলবেন তিনি। গোল করার পর পেঙ্গুইনের মতো লাফিয়ে উদযাপন করাটা কুকুরেয়ার স্বতন্ত্র পরিচয় হয়ে উঠেছে। মাঠে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি মাঠের বাইরের একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার প্রতীক। কুকুরেয়ার মাঠে লম্বা কোঁকড়ানো খোলা চুলের পেছনে রয়েছে এক বাবার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা।
কোঁকড়ানো বড় চুল যখন ছেলের কাছে তার পরিচিতি
তার লম্বা কোঁকড়ানো চুল ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পরিচিত এক পরিচয়। অনেকেই এটিকে ফ্যাশন বলে মনে করলেও, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবিক গল্প। কুকুরেয়া জানিয়েছেন, তার বড় ছেলে মাতেও অটিজম স্পেকট্রামে আক্রান্ত। ছেলের জন্যই তিনি চুল ছোট করেন না এমনকি বেঁধেও রাখেন না। ছেলের কাছে এই চুল যেন বাবাকে সহজে চিনে নেওয়ার একটি পরিচিত স্পর্শ, নিরাপত্তা আর ভালোবাসার প্রতীক।
বিশ্বজুড়ে অনেক শিশুর মতো কুকুরেয়ার সন্তানেরও অটিজম স্পেকট্রামে রয়েছে। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হলো একটি স্নায়বিক ও বিকাশজনিত অবস্থা, যা সামাজিক যোগাযোগ, আচরণ এবং শেখার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এটি এমন একটি বিস্তৃত অবস্থা যেখানে সামাজিক যোগাযোগের সমস্যা, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ এবং সংবেদনশীলতার ভিন্নতা প্রধান লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পায়।
অটিজমে আক্রান্ত অনেক শিশু পরিচিত দৃশ্য, গন্ধ কিংবা স্পর্শের মাধ্যমে স্বস্তি অনুভব করে। কুকুরেয়া বুঝেছিলেন, তার লম্বা কোঁকড়ানো চুল সন্তানকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এটি আর শুধু তার ব্যক্তিগত স্টাইল নয়-এটি হবে ছেলের জন্য একটি ভালোবাসার বন্ধন। ম্যাচের সময়ও তিনি চুল পুরোপুরি বেঁধে ফেলেন না। কারণ কুকুরেয়ার ছেলে তাকে যেন সহজেই চিনতে পারেন এই চুল দেখে।
২০২২ সালে কুকুরেলা চেলসিতে যোগ দেওয়ার পরপরই মাতেও অটিজমে আক্রান্ত তা শনাক্ত হয়। কুকুরেয়া এবং তার স্ত্রী, ক্লডিয়া রদ্রিগেজ, তাদের ছেলে মাতেওকে বড় করার অভিজ্ঞতা এবং অটিজমে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর সে যে সংগ্রামের সম্মুখীন হয়, তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। ২০২২ সালে কুকুরেলা চেলসিতে যোগ দেওয়ার পরপরই মাতেও অটিজমে আক্রান্ত তা শনাক্ত হয়। কিন্তু তারা ভেঙে পড়েননি। মাতে যেন তার জীবন উপভোগ করতে পারে সেই চেষ্টা বাবা-মা হিসেবে তারা করে যাচ্ছেন সব সময়।
এজন্য কুকুরেয়া মাঠে থাকলেও ছেলেকে নিয়ে চিন্তিত থাকেন। তিনি নিশ্চিত করতে চান তার ছেলে মাতে যেন তার খেলা উপভোগ করতে পারে এবং বাবাকে চিনতে পারে। কুকুরেয়া ও তার স্ত্রী মাতের পর আরও দুই সন্তানের বাবা-মা হন। তবে তারা স্বাভাবিক এবং সুস্থ। ফলে মাতের প্রতি তাদের মনোযোগ থাকে সবচেয়ে বেশি।
২০২৬ বিশ্বকাপে শুরু থেকেই স্পেন ছিল দুর্দান্ত ছন্দে। তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া দলটি প্রতিপক্ষকে একের পর এক হারিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। শেষ ষোলোতে পর্তুগাল, কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম এবং সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে স্পেন। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত এই লড়াইয়ে স্পেন শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়।
বিশ্বকাপে কুকুরেয়ার দায়িত্ব ছিল বাম প্রান্ত সামলানো। আক্রমণে উঠে যাওয়া, দ্রুত নিচে নেমে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো এবং প্রয়োজনমতো বল দখলে রাখা সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। ফাইনালেও আর্জেন্টিনার ডান প্রান্তের আক্রমণ ভেঙে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। ম্যাচজুড়ে তার আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স স্পেনের রক্ষণকে আরও দৃঢ় করে তোলে। একজন ডিফেন্ডারের কাজ অনেক সময় গোলদাতাদের মতো চোখে পড়ে না। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে কুকুরেয়া দেখিয়ে দিয়েছেন, শিরোপা জিততে শক্তিশালী রক্ষণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে ট্রফি জেতা একজন ফুটবলারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে
ফুটবলের বাইরের আরেকটি জয়
বিশ্বকাপে ট্রফি জেতা একজন ফুটবলারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে। কিন্তু কুকুরেয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বড় হয়ে উঠেছে একজন বাবা হিসেবে। তার গল্প অনেক পরিবারকে সাহস জুগিয়েছে, বিশেষ করে যাদের সন্তান অটিজম স্পেকট্রামে রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ লিখেছেন, একজন আন্তর্জাতিক তারকা হয়েও তিনি সন্তানের প্রয়োজনকে সবার আগে রেখেছেন। এটাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। আজকের ক্রীড়াবিশ্বে যেখানে চেহারা, স্টাইল ও ব্র্যান্ডিং নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা হয়, সেখানে কুকুরেয়ার লম্বা চুলের পেছনের কারণ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সব সিদ্ধান্তই ফ্যাশনের জন্য হয় না; কিছু সিদ্ধান্ত নিখাদ ভালোবাসার।
আরও পড়ুন শিশুদের হাত ধরে কেন মাঠে আসেন খেলোয়াড়রা? জানুন এর রহস্য কুকুরেয়া অনুপ্রেরণার এক নাম
বিশ্বকাপ জয়ের পর স্পেনজুড়ে শুরু হয় উৎসব। রাজধানী মাদ্রিদ থেকে বার্সেলোনা সব জায়গায় লাখো সমর্থক রাস্তায় নেমে উদযাপন করেন। ট্রফি হাতে খেলোয়াড়দের বিজয়যাত্রায় সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েন কুকুরেয়াও। তবে শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হিসেবেই নয়, একজন দায়িত্বশীল বাবা হিসেবেও তিনি মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেন।
ফুটবল শেষ পর্যন্ত শুধু গোল, ট্রফি বা পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি মানুষের গল্পও। কুকুরেয়ার লম্বা চুল সেই মানবিক গল্পেরই একটি অংশ, যা মনে করিয়ে দেয় একজন চ্যাম্পিয়নের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু মাঠের নায়ক হওয়া নয়, পরিবারের কাছেও একজন নায়ক হয়ে ওঠা। ২০২৬ বিশ্বকাপ স্পেনকে দিয়েছে নতুন গৌরব। আর সেই গৌরবের মাঝেই মার্ক কুকুরেয়া শিখিয়ে দিলেন, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধই একজন মানুষকে সত্যিকারের মহান করে তোলে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস






























