বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে আগামী ১৩ বছরে মোট ৭৮ কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী, এই এলএনজি আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন পায়। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বললেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা এই এলএনজি আমদানির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ছয়টি করে কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। সব মিলিয়ে ১৩ বছরে মোট ৭৮টি কার্গো বাংলাদেশে আসবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপস্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে পেট্রোবাংলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, ওমান ও সৌদি আরবের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মোট সাতটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি কার্যকর রয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় নিয়মিত এলএনজি আমদানি হচ্ছে। তবে দেশে গ্যাসের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন উৎস থেকে এলএনজি আমদানির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সেই প্রয়োজন থেকেই গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে নতুন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই প্রস্তাবকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকারি নথিতে এটিকে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) ভিত্তিক আমদানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু গানভর ইউএসএ এলএলসি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সাধারণভাবে জিটুজি চুক্তি দুই দেশের সরকার বা সরকার মনোনীত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হয়ে থাকে। ফলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির আইনগত ভিত্তি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটিকে পুরো ১৩ বছরের জন্য চূড়ান্তভাবে দায়িত্ব দেওয়া নাও হতে পারে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে গানভরের এলএনজি বহনকারী জাহাজ বাংলাদেশে আসা শুরু করবে। তাদের সরবরাহ ও কার্যক্রম সন্তোষজনক হলে পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক সমঝোতা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এই এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুসরণ করেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, পিপিআরের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নিত না।
একটি এলএনজি কার্গোতে থাকে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) সমপরিমাণ গ্যাস, যা প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাসের সমান।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২১ দশমিক ৫ থেকে ২২ মার্কিন ডলারের মধ্যে রয়েছে। প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ ডলার ধরে হিসাব করলে একটি কার্গোর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭ কোটি ৩৯২ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা (প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ধরে)। সেই হিসাবে ৭৮টি কার্গো আমদানিতে মোট ব্যয় হতে পারে প্রায় ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হলেও বর্তমান দর অনুযায়ী এই হিসাব করা হয়েছে।
সরকারি ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ)। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির সদ্য যোগ দেওয়া প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাইদ মো. কামরুজ্জামান বলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মাত্র, তাই বিষয়টি সম্পর্কে এখনই কোনো মন্তব্য করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
অন্যদিকে বিপিপিএর সাবেক মহাপরিচালক (বর্তমান পদবিতে সাবেক সিইও) ফারুক হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের জিটুজি চুক্তি কীভাবে হবে, সেটি স্পষ্ট নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গানভর ইউএসএ এলএলসিকে মনোনীত করে থাকে, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এমন কোনো মনোনয়নের তথ্য না থাকলে এই চুক্তির জিটুজি কাঠামো ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, পিপিআর ২০২৫ অনুযায়ী সরকার, সরকারের অধীন সংস্থা অথবা সরকার কর্তৃক মনোনীত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই জিটুজি চুক্তি করা যায়। সেই শর্ত এই ক্ষেত্রে পূরণ হয়েছে কি না, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।





























