ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন হলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গেস্টরুম ও গণরুম সংস্কৃতির অন্ধকার দিক নিয়ে একটি নতুন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘গেস্টরুম-গণরুম: নির্যাতনের দাগ ও খতিয়ান’ শীর্ষক এই প্রামাণ্য গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই শহিদ স্মৃতি ভবন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই বইটিতে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো বিভিন্ন নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থী, হল সংসদের প্রতিনিধি ও ডাকসুর কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখতে গিয়ে সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ জানান যে, এই প্রকাশনাটি কেবল একটি সাধারণ বই নয়, এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের কষ্ট, ভীতি ও নির্যাতনের এক ঐতিহাসিক দলিল। তিনি উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক প্রভাব ও নানা ধরনের চাপের কারণে অনেক শিক্ষার্থী অতীতে তাদের ওপর হওয়া অবিচারের কথা প্রকাশ্যে বলার সাহস পাননি। সেইসব অবদমিত কণ্ঠস্বর এবং না-বলা বেদনাগুলোকে লিখিত রূপ দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্ধকার এই অধ্যায় সংরক্ষণ করাই ছিল এই গ্রন্থ প্রকাশের মূল লক্ষ্য। বইটি তৈরিতে তার সঙ্গে আরও একদল তরুণ সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে তিনি অনুষ্ঠানে জানান।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস. এম. ফরহাদ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন যে, হলের রুমে রুমে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো এই ধরনের নিপীড়নমূলক কার্যক্রম স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ এবং মৌলিক মানবাধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার মান এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্মগত অধিকার বলে তিনি মন্তব্য করেন। অতীতের এসব বেদনাদায়ক ঘটনা সঠিকভাবে নথিবদ্ধ থাকা জরুরি বলে মত প্রকাশ করে তিনি বলেন, যেন ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন ত্রাসের রাজত্ব পুনরায় কায়েম করতে না পারে। শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে ডাকসু সবসময় সচেষ্ট থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন যে, আবাসিক হলের গেস্টরুম ও গণরুমে শিক্ষার্থীদের ওপর যে নিদারুণ নির্যাতন চালানো হতো, তার ইতিহাস অত্যন্ত মর্মান্তিক। বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবেই শক্তি প্রদর্শন, আধিপত্য বিস্তার কিংবা ভীতি ছড়ানোর জায়গা হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। বরং ক্যাম্পাস হওয়া উচিত স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধি বিকাশের নিরাপদ একটি আশ্রয়স্থল। অতীতের দুঃস্মৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এমন একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস গড়ে তোলার ডাক দেন তিনি, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীকে তার ব্যক্তিগত মত বা পরিচয়ের জন্য হয়রানির শিকার হতে হবে না।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে গেস্টরুম ও গণরুমের নৃশংসতার প্রত্যক্ষ শিকার বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের জীবনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা জনসমক্ষে তুলে ধরেন। তাদের এই হৃদয়বিদারক বক্তব্য উপস্থিত শ্রোতাদের নাড়া দেয় এবং পুরো পরিবেশকে গম্ভীর করে তোলে। পরবর্তীতে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের হাতে সদ্য প্রকাশিত বইটির সৌজন্য কপি তুলে দেন। গ্রন্থটির সহ-সম্পাদনায় যারা যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন উপরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাও এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।


































