বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তখন অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। হাওরের মানুষটির সহজাত রসবোধ আর প্রাণখোলা কথাবার্তায় হাসেননি—এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে, মোট ১০ বছর তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে। এরও আগে, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান অসুস্থ হলে স্পিকারের দায়িত্বে থেকেই কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আবদুল হামিদের দায়িত্বকালেই অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দুটি নির্বাচনই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে আলোচিত। বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন, নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি সমালোচনা এবং সামনে ২০২৪ সালের নির্বাচন—সব মিলিয়ে তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সামনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি সিদ্ধান্ত।
আমরা প্রায়ই বলি, রাষ্ট্রপতির পদটি অলংকারস্বরূপ; রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে। কথাটি সাংবিধানিক বাস্তবতার দিক থেকে পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু এটাও সত্য, রাষ্ট্রপতিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ব্যক্তি, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার প্রতীক। রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে এই পদের গুরুত্ব হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যায়।
সে সময় সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আওয়ামী লীগের ভেতরে-বাইরে অনেক নাম ঘুরছিল। আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, ওবায়দুল কাদের, এমনকি কয়েকজন সাবেক আমলার নামও আলোচনায় ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেন সব হিসাব-নিকাশকে ছাপিয়ে সামনে এলেন পাবনার সন্তান, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং দুদকের সাবেক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন—যাকে সবাই চেনেন ‘চুপ্পু’ নামে।
আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর নাম ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমরা এমন কোনো রাষ্ট্রপতি করিনি, যার নাম ইয়াজউদ্দিন, কার্যক্রমে ‘ইয়েসউদ্দিন’।” বক্তব্যটি ছিল বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ভূমিকার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর নিয়োগ নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠেছিল। দুদকের সাবেক কমিশনার হিসেবে সাংবিধানিক পদে তাঁর নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়েছিল। কিন্তু সেই আইনি বিতর্ক শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
এরপর আসে ২০২৪ সালের নির্বাচন। আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করে। কিন্তু নির্বাচনের পর থেকেই রাজনীতির আকাশে জমতে থাকে অস্বস্তির মেঘ। প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে টানাপোড়েন, জনমনে ক্ষোভ এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতা একসময় জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের দিকে দেশকে নিয়ে যায়। ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়।
সরকার বদলালেও রাষ্ট্রপতি বদলাননি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দায়িত্বে বহাল থাকেন মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে নতুন সরকারকেও শপথবাক্য পাঠ করান তিনিই।
এই একটি তথ্যই তাঁকে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে দেয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী বিএনপি সরকার—এই তিন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার তিন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন একই রাষ্ট্রপতি।
এই সময়জুড়ে তাঁর পদত্যাগের দাবি একাধিকবার উঠেছে। আন্দোলন হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে, রাজনৈতিক চাপও কম ছিল না। কিন্তু তিনি দায়িত্বে বহাল ছিলেন। অবশেষে, ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলেন মো. সাহাবুদ্দিন। যদিও তাঁর সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
একজন রাষ্ট্রপতির বিদায় কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়; অনেক সময় সেটি একটি রাজনৈতিক সময়েরও সমাপ্তি। মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এমন এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল, যেখানে ক্ষমতা বদলেছে, সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল পাল্টেছে—কিন্তু রাষ্ট্রপতির আসনে দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন একই মানুষ।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেই রায় সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই নিশ্চিত—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক পর্বের তিন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করানো একমাত্র রাষ্ট্রপতি হিসেবে।





























