অনুমোদন ছাড়াই অনলাইনে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট থেকে সংশ্লিষ্ট সব ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের কাছে এসংক্রান্ত একটি কড়া নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০২৪ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈধ লাইসেন্স ছাড়া এ ধরনের কোনো আর্থিক লেনদেন বা ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। মূলত সাধারণ মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতেই এই অবৈধ পেমেন্ট চ্যানেলগুলো চিরতরে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, এই প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত অ্যাপগুলো গ্রাহকদের অত্যন্ত চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে এবং পরবর্তীতে ঋণের নামে অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক চড়া সুদের হার আদায় করে থাকে। শুধু তাই নয়, ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে চক্রটি নানা ধরনের অনৈতিক ব্ল্যাকমেইল ও চরম হয়রানির আশ্রয় নেয়। অ্যাপগুলো সাধারণত ডাউনলোডের সময় কৌশলে ব্যবহারকারীর মুঠোফোনের ব্যক্তিগত গ্যালারি, সামাজিক যোগাযোগের কনট্যাক্ট লিস্ট, ছবি, ভিডিও এবং বিভিন্ন সংবেদনশীল বার্তার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে পরিশোধে ব্যর্থতার অজুহাতে এসব ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়।
এই অনৈতিক তৎপরতা রোধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিটিআরসি, বিএফআইইউ এবং ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা নগদসহ সব তফসিলি ব্যাংককে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছে। চিহ্নিত হওয়া এসব অবৈধ ঋণদাতা অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত সব ধরনের পেমেন্ট সেবা তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এই ধরনের ক্ষতিকর অ্যাপস সম্পর্কে সাধারণ গ্রাহকদের ব্যাপকভাবে সচেতন করে তোলার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, অনলাইনে ঋণ প্রদানের এই পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের আওতাভুক্ত না হলেও সাধারণ মানুষ যেন প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশে কেবল নির্দিষ্ট ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নিবন্ধিত মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানগুলোই আইনগতভাবে ঋণ বিতরণের এখতিয়ার রাখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত নানা প্রলোভনপূর্ণ বিজ্ঞাপন দেখে হুট করে ঋণ নেওয়ার আগে নাগরিকদের আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও অনেকে না বুঝে এসব চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছেন, যা রোধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।

































