বাংলাদেশে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ দিন দিন আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করছে, যার ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০ হাজারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু-সংক্রান্ত নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, শুধু একদিনেই নতুন করে এক হাজার ৫৬ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছর সর্বমোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ২৭৬ জনে। বর্ষাকালীন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ ও চিকিৎসকরা দেশজুড়ে সতর্কতা জারি করলেও রোগী ভর্তির হার কোনোভাবেই কমছে না।
রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানির সংখ্যাও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সম্প্রতি একদিনে নতুন করে আরও দু’জন ডেঙ্গুগ্ন রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যার ফলে এই বছর এ পর্যন্ত মারা যাওয়া মানুষের মোট সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ১৪৩ জনে। মারা যাওয়া সর্বশেষ দুই জনই পুরুষ বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যাদের একজনের বয়স ছয় থেকে দশ বছরের মধ্যে এবং অন্যজন বয়স্ক নাগরিক। সামগ্রিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গুতে নারী ও পুরুষের আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার প্রায় কাছাকাছি থাকলেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রাণহানির ক্ষেত্রে নারীদের হার কিছুটা বেশি অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ।
চলতি বছর মাসভিত্তিক ডেঙ্গু পরিস্থিতির পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বছরের শুরুতে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরবর্তীতে তা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। বছরের প্রথম দুই মাসে মৃত্যুর সংখ্যা খুবই কম থাকলেও জুন মাস থেকে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং বর্ষার পরের মাসগুলোতে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। জুলাই মাসে ৩৬ জন এবং আগস্টে তা বেড়ে ৪৩ জনে দাঁড়ায়। তবে চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনেই আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে শুধু এই মাসেই এখন পর্যন্ত ৪৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি গত ৮ সেপ্টেম্বর একদিনেই সর্বোচ্চ নয়জন রোগীর মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের অন্যতম একটি ভয়াবহ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও হাসপাতালভিত্তিক তথ্য বিশ্লেષণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও প্রাণহানির হার সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন হাসপাতালগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। রাজধানী ছাড়াও খুলনা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলাতেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশ সংকটজনক রূপ নিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, আক্রান্ত ৫০ হাজার ২৭৬ জন রোগীর মধ্যে ইতোমধ্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ শেষে ৪৬ হাজার ৬৯৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে সামাজিকভাবে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।


































