বাংলাদেশে বর্তমানে বাত ও হাড়ের নানা রোগ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ত্রিশ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে বাতরোগে আক্রান্ত। দীর্ঘমেয়াদি এই শারীরিক সমস্যার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন মাত্রার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে ব্যথার তীব্রতার কারণে বহু মানুষ তাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন, যা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সামগ্রিক সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অথচ অসংক্রামক ব্যাধির দীর্ঘ তালিকার মধ্যে এই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিটি এখনো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সম্মেলনে উপস্থাপित বিভিন্ন গবেষণা তথ্যে দেখা গেছে যে বাতরোগের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে গিয়ে দেশের সাধারণ পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে। একদিকে চিকিৎসাপত্রের পেছনে নিয়মিত বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে রোগীর আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো দ্বিমুখী আর্থিক চাপের শিকার হচ্ছে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কিংবা স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিসের মতো জটিল রোগের ক্ষেত্রে বার্ষিক চিকিৎসার পেছনে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এছাড়া হাড় ভেঙে যাওয়ার অস্ত্রোপচার বা হাঁটু প্রতিস্থাপনের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তারা ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। প্রায় সতেরো কোটির এই জনবহুল রাষ্ট্রে প্রয়োজনের তুলনায় বিশেষজ্ঞ রিউম্যাটোলজিস্টের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো বাতরোগও নিয়মিত তদারকি ও সচেতনতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, মানসম্মত চিকিৎসাসেবার ঘাটতি এবং অপ্রতুল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কারণে অনেক রোগী শেষ পর্যন্ত স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছেন। অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই যথেচ্ছভাবে বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেন, যা কিডনিসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য চিকিৎসকরা নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। একইসঙ্গে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও ব্যাপকভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আয়োজক সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে বাতরোগীদের কল্যাণে তারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। দুস্থ ও অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের জন্য ট্রাস্টের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ভবিষ্যতে রোগীদের সেবাদান প্রক্রিয়া আরও সহজতর করার লক্ষ্যে বিশেষ সার্ভিস কার্ড ও সাপোর্ট সেন্টার চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের বাত রোগীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক রিউমাটোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও রয়েছে তাদের। দিনব্যাপী আয়োজিত এই সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত রোগী ও বিশিষ্ট চিকিৎসাবিদেরা অংশগ্রহণ করেন।



































