অন্তবর্তী সরকারের আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা সমলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা দাবি করছেন অধ্যাপক নকীবের শাসনামলে শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে। যদিও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নকীব বিষয়টি অকপটে অস্বীকার করেছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাবির উপাচার্য পদে নিয়োগ পান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব। ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর উপাচার্য পদে নিয়োগ লাভের আগে পদার্থবিজ্ঞানের এই শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জিয়া পরিষদের সদস্য পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলামকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন। এর ফলে কার্যত সাবেক ভিসি অপসারিত হন।
বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের অভিযোগ, সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব একটি বিশেষ দলকে সব ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন এবং অন্যদের বঞ্চিত করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, সাবেক ভিসি শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রাধান্য দিয়েছেন, অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে জনবল নিয়োগ দিয়েছেন, গবেষণা খাতের প্রায় দেড় কোটি টাকার বরাদ্দ নিজের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে বণ্টন করেছেন, শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা (পোষ্য কোটা) একক সিদ্ধান্তে বাতিল করেছেন, ছয়টি অনুষদের নির্বাচিত ডিনদের মব ও হুমকি দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন, একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন এবং তাদের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি, সর্বস্তরে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) রাবি শাখার সভাপতি ও ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুনুর রশিদ বলেন, তৎকালীন উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব নিয়োগের বিষয়ে খুব তাড়াহুড়ো করছিলেন। এত অল্প সময়ে তিনি যত নিয়োগ দিয়েছেন, তা অন্যান্য ভিসিরা চার-পাঁচ বছরেও দেননি। প্রশাসন বারবার বিভাগগুলোকে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে। কোনো কোনো বিভাগে রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে দুইবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমরা এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করার জন্য অনেক নথিপত্রও সংগ্রহ করেছিলাম। নিয়োগপ্রাপ্ত দুই শতাধিক শিক্ষকের অধিকাংশই একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের। এছাড়াও, ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় শুধু নামমাত্র একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যার কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল।
তিনি আরও বলেন, অল্প সময়ে তিনি নিয়োগ ও রাকসু বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লাগেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা (পোষ্য কোটা) নিজেই বাতিল করেন। এরপর তিনি ছয়টি অনুষদের নির্বাচিত ডিনকে মব ও হুমকি দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করেন। আবাসিক হলগুলোতে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেন। গবেষণায় প্রশাসনের প্রায় দেড় কোটি টাকার বরাদ্দ তিনি ও তার ঘনিষ্ঠরা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন, এ তথ্য আমরা পত্রিকায় প্রকাশের পর জানতে পেরেছি। মব এবং একটি ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিলেন। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিস্টেমকে গড়ে তোলা দরকার ছিল, তখন তিনি মব কালচার ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে পিছিয়ে দিয়েছেন।
জিয়া পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ছাত্র কর্তৃক শিক্ষকদের মারধরের ঘটনায় আমরা বিচার চেয়েছি, কিন্তু বিচার হয়নি। এখন এগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত দেখতে চাই। শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও অনেক অভিযোগ এসেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। গবেষণা বরাদ্দের বিষয়টিও তদন্ত হওয়া উচিত। প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান উপাচার্যের কাছে এসব খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।
এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে সদ্য অপসারিত উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব বলেন, কোথাও কোনো অনিয়ম হয়নি। সবই ঠিক আছে। বলা হচ্ছে, ৯০ ভাগ একটি বিশেষ দলের। যারা অহর্নিশ এই মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছে তাদের দায়িত্ব এই ৯০ ভাগের নাম পরিচয় প্রকাশ করা। না পারলে, লজ্জিত হওয়া। যদি লজ্জা থাকে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি, জামাত, এবং এনসিপি, প্রত্যেক দল থেকে শত শত তদবির এসেছে। সবচেয়ে বেশি এসেছে বিএনপির তরফ থেকে, তারপর জামাত। একটি তদবিরও আমলে নিই নি। না পাওয়ার বেদনা এবং পাত্তা না পাওয়ার কারনে, যাদের কষ্ট, সেটা আমি বুঝি। প্রমান হাজির করুন, আমার জানা দরকার। আমার জানায় একটি ক্ষেত্রেও জেনে বুঝে একজনকেও অন্তত আমি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রোমোট করি নি।
এ বিষয়ে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, নিয়োগের ব্যাপারে অস্বচ্ছতা, গবেষণার বরাদ্দ, মব করা বা ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা- সবই আমার নজরে আছে। এসব বিষয়ের অবশ্যই একটি সুষ্ঠু তদন্তের মধ্যে আসা উচিত। যেন মানুষ জানতে পারে প্রকৃত ঘটনা কি ঘটেছে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। যদি মনে হয় এগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার আমার প্রশাসন সেটি করবে। ক্যাম্পাসে কোনো মব হওয়ার সুযোগ নেই। তাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও অভিযোগ থাকলে প্রক্টর দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে। তাদের জানাবে, তারা ব্যবস্থা নিবে।
সায়েম /রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়











