ঢাকা ১০:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ

নানা সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা

মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বহুমুখী সংকট বিরাজ করছে। শিক্ষক সংকট, নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের চরম দুরবস্থার কারণে এসব এলাকার শিক্ষা কার্যক্রম একপ্রকার থমকে গেছে। উত্তাল নদী পেরিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অথচ এতসব সমস্যা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় চরাঞ্চলের সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই তিন উপজেলায় মোট ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সুতালড়ি রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোতেও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে অনেক প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম। এর মধ্যে শিবালয়ে ৫টি, হরিরামপুরে ১৩টি এবং দৌলতপুরে ৩৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলোতে কর্মরত মোট ২৩৫ জন শিক্ষককে নানা প্রতিকূলতার মাঝে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই একাধিক সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে যাতায়াতের বেহাল দশাকে দায়ী করা হচ্ছে। পদ্মা নদীর ভাঙন এবং নৌযাননির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। অনেক শিক্ষককে প্রতিদিন মূল ভূখণ্ড থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয়, যার ফলে তাদের ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। নৌযানের সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং মাঝেমধ্যে মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষকদের যাতায়াত বাবদ অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরমান আলী জানান, যাতায়াতেই প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ও তিনশ টাকার মতো খরচ হয়, অথচ দুর্গম এলাকায় কাজের জন্য তাদের কোনো বিশেষ ভাতা দেওয়া হয় না। মাস শেষে বেতনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কেবল যাতায়াত খরচেই শেষ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষকদের ওপর মারাত্মক আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে গিয়ে শিক্ষকরা শারীরিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়েন, যা তাদের পাঠদানের মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার অত্যন্ত কম হওয়ায় শিক্ষার মান নিম্নমুখী হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মূলত কৃষিকাজ ও দিনমজুরির সঙ্গে যুক্ত থাকায় পরিবারের আয়ের প্রয়োজনে অনেক শিশুই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজে জড়িয়ে পড়ে। ফলে অভিভাবকদের অনেকেই সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর চেয়ে পারিবারিক ও কৃষিকাজকে বেশি প্রাধান্য দেন। এদিকে চর এলাকায় শিক্ষকদের জন্য কোনো ধরনের আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়, যা নারী শিক্ষকদের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও সমস্যার সৃষ্টি করে। এর ওপর মোবাইল নেটওয়ার্কের চরম দুর্বলতার কারণে শিক্ষক ও তাদের পরিবারের মধ্যে জরুরি যোগাযোগ অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, বন্যা বা নদীভাঙনের সময় যোগাযোগের এই মাধ্যমগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ায় শিক্ষক ও তাদের পরিবার চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটায়। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে অনেক সময় শিক্ষকরা নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারেন না, যার ফলে তাদের নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখিও হতে হয়।

চরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার এই বেহাল দশা থেকে উত্তরণে দ্রুত সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শূন্যপদগুলোতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষকদের জন্য আবাসন সুবিধা চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে এবং অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। মানিকগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গকুল চন্দ্র দেবনাথ জানিয়েছেন যে, এই সংকট নিরসনে একটি পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে এবং তা সম্পন্ন হলে অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এছাড়া জেলা প্রশাসক নাজমুন সুলতানা আশা প্রকাশ করেছেন যে, কর্মস্থলে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চরাঞ্চলে আবাসন সুবিধা চালুর বিষয়টি নিয়ে তারা গুরুত্বের সাথে কাজ করছেন। একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই কেবল চরাঞ্চলের এই অবহেলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

জনপ্রিয়

নিখোঁজের ছয় দিন পর নারীর মাটিচাপা মরদেহ উদ্ধার, সাবেক স্বামী আটক

নানা সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা

প্রকাশিত ০৭:০০:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বহুমুখী সংকট বিরাজ করছে। শিক্ষক সংকট, নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের চরম দুরবস্থার কারণে এসব এলাকার শিক্ষা কার্যক্রম একপ্রকার থমকে গেছে। উত্তাল নদী পেরিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অথচ এতসব সমস্যা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় চরাঞ্চলের সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই তিন উপজেলায় মোট ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সুতালড়ি রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোতেও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে অনেক প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম। এর মধ্যে শিবালয়ে ৫টি, হরিরামপুরে ১৩টি এবং দৌলতপুরে ৩৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলোতে কর্মরত মোট ২৩৫ জন শিক্ষককে নানা প্রতিকূলতার মাঝে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই একাধিক সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে যাতায়াতের বেহাল দশাকে দায়ী করা হচ্ছে। পদ্মা নদীর ভাঙন এবং নৌযাননির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। অনেক শিক্ষককে প্রতিদিন মূল ভূখণ্ড থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয়, যার ফলে তাদের ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। নৌযানের সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং মাঝেমধ্যে মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষকদের যাতায়াত বাবদ অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরমান আলী জানান, যাতায়াতেই প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ও তিনশ টাকার মতো খরচ হয়, অথচ দুর্গম এলাকায় কাজের জন্য তাদের কোনো বিশেষ ভাতা দেওয়া হয় না। মাস শেষে বেতনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কেবল যাতায়াত খরচেই শেষ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষকদের ওপর মারাত্মক আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে গিয়ে শিক্ষকরা শারীরিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়েন, যা তাদের পাঠদানের মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার অত্যন্ত কম হওয়ায় শিক্ষার মান নিম্নমুখী হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মূলত কৃষিকাজ ও দিনমজুরির সঙ্গে যুক্ত থাকায় পরিবারের আয়ের প্রয়োজনে অনেক শিশুই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজে জড়িয়ে পড়ে। ফলে অভিভাবকদের অনেকেই সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর চেয়ে পারিবারিক ও কৃষিকাজকে বেশি প্রাধান্য দেন। এদিকে চর এলাকায় শিক্ষকদের জন্য কোনো ধরনের আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়, যা নারী শিক্ষকদের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও সমস্যার সৃষ্টি করে। এর ওপর মোবাইল নেটওয়ার্কের চরম দুর্বলতার কারণে শিক্ষক ও তাদের পরিবারের মধ্যে জরুরি যোগাযোগ অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, বন্যা বা নদীভাঙনের সময় যোগাযোগের এই মাধ্যমগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ায় শিক্ষক ও তাদের পরিবার চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটায়। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে অনেক সময় শিক্ষকরা নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারেন না, যার ফলে তাদের নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখিও হতে হয়।

চরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার এই বেহাল দশা থেকে উত্তরণে দ্রুত সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শূন্যপদগুলোতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষকদের জন্য আবাসন সুবিধা চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে এবং অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। মানিকগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গকুল চন্দ্র দেবনাথ জানিয়েছেন যে, এই সংকট নিরসনে একটি পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে এবং তা সম্পন্ন হলে অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এছাড়া জেলা প্রশাসক নাজমুন সুলতানা আশা প্রকাশ করেছেন যে, কর্মস্থলে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চরাঞ্চলে আবাসন সুবিধা চালুর বিষয়টি নিয়ে তারা গুরুত্বের সাথে কাজ করছেন। একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই কেবল চরাঞ্চলের এই অবহেলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন মহল।