রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গোপন বৈঠক চলাকালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সন্দেহে আড়াইশ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। সম্প্রতি শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউর ওই কার্যালয়ে আয়োজিত সভায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুনতে পেয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকাররা সন্দেহভাজনদের ঘেরাও করেন। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালিয়ে তাদের ৫টি প্রিজনভ্যানে করে পল্টন ও শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর এলাকা জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। ওই ভবনের পাশেই নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থাকায় একটি সংবেদনশীল স্থানে এমন গোপন সভা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে এবং এই বৈঠকের নেপথ্যে কোনো নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ে সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ডভাবে ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় কর্নেল তাহের মিলনায়তনে জড়ো হতে শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে ভেতর থেকে স্লোগান ভেসে এলে ব্যবসায়ীদের সন্দেহ হয়। তারা দরজা খোলার চেষ্টা করলে ভেতর থেকে বাধা দেওয়া হয় এবং পরে দরজা খুললে চার শতাধিক মানুষের উপস্থিতি দেখে তারা হতবাক হয়ে যান। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কিছু লোক সেখান থেকে পালিয়ে গেলেও অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এবং বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ঘটনাস্থলে এসে ভবনটি ঘিরে ফেলেন এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। জনস্রোতের কারণে পুলিশ বাধ্য হয়ে ওই পাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে বিকল্প পথে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করে। ঘটনাস্থল থেকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যকেও আটক করা হয়, যিনি সেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালনের দাবি করলেও এর কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।
এদিকে আটক ব্যক্তিদের পল্টন ও শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে তাদের স্বজন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ভিড় করেন। পল্টন থানায় পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় আটকদের বিভিন্ন কক্ষে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তাদের পরিচয় ও পূর্বের রেকর্ড যাচাইয়ের জন্য দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। যুবদল ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেছেন যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লোক এনে এই গোপন বৈঠকের মাধ্যমে বড় ধরনের নাশকতার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিল। পলাতক ফ্যাসিবাদের দোসররা যাতে ঢাকায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, সেজন্য নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের অনেকের স্বজনরা থানায় এসে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন এবং আটকদের মুক্তির দাবি জানাতে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, আটকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং থানায় পাঠানো বার্তার জবাব আসার পর তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে এই ঘটনার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে জাসদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে এটি কোনো গোপন বৈঠক ছিল না, বরং তাদের একটি পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা ছিল। জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন জানান, প্রতিনিধি সভায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় চারশ নেতাকর্মী এসেছিলেন এবং অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য আগেই পুলিশ প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, সভা চলাকালে বিএনপির নেতাকর্মীরা এসে প্রথমে হামলা ও মারধর চালায় এবং পরবর্তীতে পুলিশ এসে তাদের সব নেতাকর্মীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে সভার অনুমতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া না গেলেও, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে যে পরিস্থিতি ও প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। উল্লেখ্য, বিগত রাজনৈতিক সরকারের অন্যতম সহযোগী এই দলের শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাজার রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ধরনের বৈঠক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।





































