হৃদ্রোগের চিকিৎসায় রিং বসানো কিংবা বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হওয়ার পর রোগীর সুস্থতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কিছু ওষুধের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে স্ট্যাটিন জাতীয় ওষুধগুলো রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল মাত্রা কমিয়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস করে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকা বড় একটি অংশ এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিয়মিত সেবন করছেন না। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী গ্লোবাল হার্ট-এ প্রকাশিত এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অতীতে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় ভোগা প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষই স্ট্যাটিন ব্যবহার করছেন না। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা এই জরিপটি পরিচালনা করেছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত ওই স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখতে পান, ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কেবল ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ স্ট্যাটিন গ্রহণ করছেন। মূলত অসংক্রামক রোগ ও সেগুলোর ঝুঁকি চিহ্নিত করতে এই জাতীয় জরিপ চালানো হয়, যেখানে তামাক সেবনের অভ্যাস, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের মতো প্রাণঘাতী অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ এবং স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বেশি মাত্রায় থাকলে রক্তনালির ভেতরে চর্বি জমে প্লাক তৈরি হয়, যা রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করে। স্ট্যাটিন জাতীয় ওষুধ এই ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে হৃদ্রোগীদের পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমিয়ে আনে। তবে কেবল যাদের হৃদ্রোগ হয়ে গেছে তারাই নন, বরং যাদের ঝুঁকি বেশি কিন্তু এখনো রোগাক্রান্ত হননি, তাদের ক্ষেত্রেও এই ওষুধ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নির্দেশনা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক প্রতিরোধ হিসেবে যাদের স্ট্যাটিন সেবন করা উচিত ছিল, তাদের মধ্যেও প্রয়োজনীয় ব্যবহারের হার যথেষ্ট কম।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও পেশাজীবী সংগঠনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের দাম কিংবা সচেতনতার অভাব এবং নিয়মিত লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা না করার প্রবণতা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এছাড়া শুধু কোলেস্টেরলের মাত্রা নয়, বরং বয়স, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করেও স্ট্যাটিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের গবেষক ও অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী উল্লেখ করেছেন যে, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম মানুষ নিয়মিত এই ওষুধ সেবন করছেন।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, দেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগের কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় রেজিস্ট্রি না থাকায় সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কিছুটা দুরূহ। বর্তমানে প্রাপ্ত বেশিরভাগ তথ্যই মূলত হাসপাতালভিত্তিক হওয়ায় কমিউনিটি পর্যায়ে প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় আগামী দশকে দেশের উল্লেখযোগ্য একটি অংশের মারাত্মক হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তাই এই নীরব ঘাতক রোগ মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসায় নিয়মতান্ত্রিক অনুবর্তিতা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে।





































