র্যাগ—আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন, তাহলে শব্দটি শুনলেই আপনার মনে তৈরি হতে পারে অন্যরকম এক ভীতি। র্যাগ বলতে আমরা কী বুঝি? নিশ্চয়ই কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন। কিন্তু এদিক থেকে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-এর র্যাগ যেন একেবারেই ভিন্ন। র্যাগিংমুক্ত এই ক্যাম্পাসে সিনিয়রদের হাতে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের নজির নেই। বরং সিনিয়র-জুনিয়রের সম্পর্ক শুধু পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; সময়ের সঙ্গে তা রূপ নেয় এক অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে, যার স্মৃতিতেই ধরা থাকে ক্যাম্পাসজীবনের সেরা দিনগুলো।
ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সারা সেমিস্টারজুড়েই থাকে সিটি, ল্যাব, কুইজের প্যারা। এই প্যারাময় লাইফে সামান্য আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে প্রতিবছর চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায়ের একটা অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয় ‘র্যাগ ডে’।
নাম শুনে মনে হতেই পারে, এটি বুঝি র্যাগিংয়ের কোনো উৎসব। কিন্তু নামে র্যাগ হলেও, ডুয়েটের এই র্যাগ প্রচলিত র্যাগিংয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত। এ যেন সিনিয়রদের হাতে জুনিয়রদের রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার এক উৎসব; আর উল্টো দিকে জুনিয়রদের হাতে সিনিয়রদের টি-শার্ট, বই, কলম, খাতা কিংবা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে পকেট খালি করে দেওয়ার উৎসব!
জুনিয়র শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন কর্নারে জড়ো হয়ে মজা করে স্লোগান দেয়—‘হই হই রই রই সিনিয়ররা গেলি কই!’ অন্যদিকে রঙ হাতে সিনিয়ররা ছুটে আসে জুনিয়রদের খুঁজতে। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে তখন তৈরি হয় এক আনন্দমুখর ‘চোর-পুলিশ’ খেলা।
কোনো জুনিয়র হয়তো ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘোষণা করে, ‘সিনিয়রদের র্যাগের ভয় পাই না।’ ব্যস, এরপরই শুরু হয় তাকে খুঁজে বের করার অভিযান। আবার কেউ লোকেশন শেয়ার করে লিখে দেয়, ‘পারলে র্যাগ দিয়ে যান।’ সেই পোস্ট দেখেই তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে সিনিয়ররা। আর শুরু হয়ে যায় লুকোচুরি আর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মজার এক খেলা।
তবে শুধু জুনিয়ররাই যে র্যাগ ডে-তে নিশ্চিন্তে থাকে, তা নয়। সিনিয়রদেরও থাকে একধরনের ‘আতঙ্ক’! যারা রঙের এই উৎসবে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, তাদের খুঁজে বের করে রুম থেকে ঘাড়ে তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জুনিয়ররা। স্লোগান দিতে দিতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় দোকান, কফি শপ কিংবা রেস্টুরেন্টে। অনেক সিনিয়র তো র্যাগ ডে আসার আগেই এসব ‘অভিযানের’ সম্ভাব্য বাজেটও প্রস্তুত করে রাখেন!
ডুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী এসএম জুবায়ের হোসেন বলেন, “র্যাগ খাওয়ার অনুভূতিটা এক ভিন্ন রকমের ফিলিংস। র্যাগ দেওয়ার চেয়ে র্যাগ খাওয়াই মজার। সারাদিন ভাইদের খুঁজেছি র্যাগ খাওয়ার জন্য, আবার জুনিয়রদের খুঁজেছি র্যাগ দেওয়ার জন্য। ডুয়েটের র্যাগ মানেই রঙ-চঙ, কাদা-পানি, একটু নাচ আর ‘হই হই রই রই’—সব মিলিয়ে দারুণ আনন্দ। আমিও সারাদিন র্যাগ খাওয়ার পর রাতে ইচ্ছা করেই ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে ভাইদের বলছি, ‘পারলে ধরে দেখান।’ ভার্সিটি লাইফ তো সিটি, ল্যাব, কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষা দিয়েই কেটে যায়। তাই এই আনন্দটুকুও উপভোগ করে ক্যাম্পাসজীবন শেষ করতে চাই।”
ডুয়েটের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী তাফসানুল রিয়াদ জানান ” গত কাল রাত থেকে ভাইদের সাথে লুকোচুরি খেলেছি কিন্তু আজ দুপুরের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে এসে ধরা পড়ে গিয়েছি। তবে র্যাগ শেষ হওয়ার সাথে সাথে ই র্যাগ দিতে আসা সিনিয়র ভাইদের ধরে হোটেলে নিয়ে গেলাম, আমাদের মন ও পেট খুশি ওদিকে ভাইদের মন খুশি হলেও পকেট ফাকা”।
র্যাগ ব্যাচের শিক্ষার্থী রায়হান রাহেল বলেন, “র্যাগ ডে আমার কাছে শুধু আনন্দ-উচ্ছ্বাসের একটি দিন নয়, বরং দীর্ঘ পাঁচ বছরের পথচলার একটি আবেগঘন সমাপ্তি। এই দিনটিতে বন্ধুদের সঙ্গে যেমন আনন্দ করি, তেমনি জুনিয়রদের সঙ্গে মজা, হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে সুন্দর কিছু স্মৃতি তৈরি হয়। একদিকে প্রিয় ক্যাম্পাস, বন্ধু ও শিক্ষকদের ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, অন্যদিকে জুনিয়রদের সঙ্গে শেষবারের মতো প্রাণখুলে আনন্দ করার অনুভূতি—দুটোই একসঙ্গে কাজ করে। এই দিনটির স্মৃতিগুলোই হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের ক্যাম্পাসজীবনের সবচেয়ে বেশি মনে পড়া মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকবে।”
ডুয়েটের র্যাগ ব্যাচের শিক্ষার্থী এসএম ইকবাল বলেন, “র্যাগ ডে আমার কাছে পরিচয় পরিবর্তনের একটি অনুষ্ঠান। এর মাধ্যমেই আমরা রানিং শিক্ষার্থী থেকে প্রাক্তন শিক্ষার্থীতে রূপান্তরিত হই। ফাইনাল ইয়ারে এসে র্যাগের অনুভূতিটা সত্যিই অন্যরকম—এখানে আনন্দ আছে, উচ্ছ্বাস আছে, বন্ধুদের সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি আর জুনিয়রদের সঙ্গে খুনসুঁটি আছে। ক্লাস শেষে একসঙ্গে হাঁটা, ক্যান্টিনে বসে চা খাওয়া, ক্যাম্পাসের পরিচিত জায়গাগুলো—সবকিছুই খুব শিগগির স্মৃতির অংশ হয়ে যাবে, যার জানান দেয় র্যাগ ডে। চার বছরের ক্লান্তি, পরীক্ষার চাপ, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, থিসিস, ক্যাপস্টোন আর অসংখ্য দুশ্চিন্তার পর র্যাগ ডে যেন শেষ কয়েকটি মুহূর্তকে আরও একটু বেশি উপভোগ করার সুযোগ। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, কঠিন সময়ের মধ্যেও আমরা কত সুন্দর স্মৃতি তৈরি করেছি।”
সব মিলিয়ে র্যাগ ডে-কে ঘিরে ডুয়েট ক্যাম্পাস ও আশপাশের আবাসিক এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। রঙের ছোঁয়ায়, হাসি-ঠাট্টায় আর সিনিয়র-জুনিয়রের বন্ধনে দিনটি হয়ে ওঠে বিদায়বেলার এক অনন্য স্মৃতি।
ডুয়েটের এই ‘র্যাগ’ তাই ভয়ের নয়—এ র্যাগ বন্ধুত্বের, ভালোবাসার, স্মৃতির এবং একসঙ্গে কাটানো ক্যাম্পাসজীবনের শেষ অধ্যায়কে রঙিন করে তোলার উৎসব।

































