সবুজ ঘাসের ডগায় বিন্দু বিন্দু শিশির জমতে শুরু করেছে। ছিপছিপে লাজুক গ্রাম্য বধূর নাকের ডগায় যেমন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠে, ঠিক তেমনি লাজুক শিশির। এরমধ্যে দিয়ে শীতের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে প্রকৃতি। দোতলায় গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছি। একটু আগে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
সুউচ্চ লাল প্রাচীরের উপরে দুটি শালিক গায়ে গা ঘেঁষে বসে আছে। তাদের পেছন থেকে সূর্য উঁকি দিয়ে উঠছে। নতুন একটি দিনের সুচীত হবার পূর্বাভাস। এভাবে অনেক বছর সূর্য ওঠা দেখা হয় নাই। আমি অনেক বছর হলো লেট নাইট করি। রাত ৩ টার পরে ঘুমাতে যাই। অথচ ছোট বেলায় আমি ভীষণ ঘুম কাতুরে ছিলাম। সন্ধ্যায় পড়তে বসলে শুধু ই ঘুম আসতো। তখন মনে মনে ভাবতাম, কে আবিষ্কার করলো এই লেখাপড়া। কোন কোন দিন বইতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম অবলিলায়। এখন ঘুম আসে না। রাতে ঔষধ খেতে হয় একটু ঘুম কেনার জন্য। আজ সারাটা দিন একটা ধকল গেছে শরীরের উপর দিয়ে।
তাই ক্লান্তিতে রাতে ভালো ঘুম হয়েছে আমার। কোন ঔষধ ই খেতে হয় নাই। আমি একা একা ঘুমাতে অভ্যস্ত। আজ আমার সাথে আরো ১৪ জন ঘুমিয়ে আছেন। আমার দুই পাশে লোকজন ঘুম এটা দেখে প্রথমে বুঝতে একটু সময় লাগলো। ১৪ জনের মধ্যে পরিচিত ৩ জন। আমার পাশেই শুয়ে আছে পাটগাতী গ্রামের মানিক সাহেবের পোতা আমার ভাতিজা সৈয়দ শামীম হাসান ও আমার এক কাকা পাচকাহনীয় গ্রামের প্রাচীন মুরব্বি গেদু মিয়ার ছেলে আজিজ কাকা। এ দুজন কে আমার সাথে ই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের কে গ্রেফতার করে রাত ৮ টার দিকে আমাকে রাত ৩ টার পরে। তাদের দুজন কে ছাড়াও আরো একজন কে চিনতে পারলাম। তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের সাদা কালো চেকের পোশাক পরে আছেন। যাদের আদালত সাজা প্রদান করেন তাদের পোশাক পরতে হয়। মানদার ভাই। মানদার ভাই একজন খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী। তিনি এই ওয়ার্ডের ইনচার্জ। তাকে ম্যাড বলেন।
আমি আজ যে রুমটায় শুয়ে আছি এ রুমটার নাম আমদানি। জেলখানায় প্রথম রাতে এখানে রাখা হয়। এখানে এনে প্রথমে রাখা হয় বলেই হয়তো এ রুমটির নাম হয়তো আমদানি।
গতরাতে (৬ নভেম্বর) রাত ৩ টায় দিকে আমার দরজায় শব্দ হলো। তারা আমার নাম ধরে ডাকলেন। আমি প্রথমে চুপ থাকি বুঝতে চেষ্টা করি এতো রাতে এরা কারা। পরে তাদের ডাকার তীব্রতায় বুঝতে পারি পুলিশ। আমাদের দেশে পুলিশ কাউকে আটকের সময় দস্যুতার সংস্কৃতি হতে কখনোই বের হতে পারে নাই। আমার বেলায় তার ব্যতিক্রম হলো না। আমি উঠে বসলাম। হাতের মোবাইল ফোনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে দেই।রাতে দেশে ও বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষের সাথে কথা হয়েছিল। বিদেশের কিছু গনমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে ও কথা হয়েছিল সেসব মুছে দেই। এরপর সাতক্ষীরার গনমাধ্যম কর্মী বন্ধু ফারুক ভাইকে আমার বাসায় পুলিশ আসার বিষয়টি অবগত করি এজন্য কিছুটা সময় লেগে যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে চাপ বাড়তে থাকে।
দরজা খুলে দিতেই তারা পরিচয় দিলেন। যার কাউকে কাউকে আমি দিনের চুরি যাওয়া আলোয় দেখেছি বৈকি।
একজন অফিসার যে আমার সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘ওসি সাহেব (জাহিদুল ইসলাম) আপনাকে ডেকেছেন।’
আহ্ ওসি সাহেবের কি রসবোধ। আমার মতো একজন রিপোর্টার, আবৃত্তি শিল্পী কে ডেকেছেন গল্প করার জন্য। ওসি সাহেবের হয়তো মন খারাপ। তার বিবাগী মন কি আজ বিচলিত, আবৃত্তি শোনবার জন্য এই গভীর নিশুথি রাতে একজন নিষ্কণ্টক, অতি সাধারণ মানুষ কে ডেকে পাঠানো হচ্ছে? ডেকে নেওয়ার কৌশলে কারাগারে পাঠানো হবে একজন শিল্পী কে যার বিরুদ্ধে ৪৭ বছরে কোন মামলা তো নয় ই এমনকি সাধারণ ডাইরী ও লিপিবদ্ধ হয় নাই!
পুলিশ অফিসার আমার রুমে প্রবেশ করতে চাইলে আমি বললাম, ‘প্লিজ কেউ ঘরে ঢুকবেন না, বাইরে ই দাঁড়িয়ে থাকবেন। আপনার কাছে যদি সার্চ ওয়ারেন্ট থাকে তাহলে ঢুকতে পারবেন।’
অফিসার চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, ‘অফিসার এখন রাত ৩ টা ১৫ আমি ঘুম ছিলাম। আমি সব বুঝতে পারছি। আমাকে ১৫ মিনিট সময় দেন। আমি ব্রাশ করবো। ফ্রেশ হবো, কিছু জামাকাপড় সাথে নেবো। এই রুমে আর ফিরে আসতে অনেক মাস সময় লাগতে পারে।’
অফিসার মৃদু হেসে আমাকে সম্মতি দিলেন। আমি ব্রাশ করে জামাকাপড় পরে তৈরি হলাম। সাথে কিছু জামাকাপড় নিয়ে নিলাম আমার ঝোলা ব্যাগে। কিছু কাগজপত্র টেবিলে রেখে আসলাম আমার সকল কাজের বিশ্বস্ত সঙ্গী আমার ভাই আমার প্রধান সেনাপতি, আমার বৈরাম খা রাকিব চৌধুরীর জন্য। যাতে সে আমার অবর্তমানে কাজ চালিয়ে নিতে পারে।
দরজা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ। আমি দরজার সামনে এগিয়ে এসে বললাম, ‘চলুন অফিসার।’ এরপর তিনি আমার হাতের আঙ্গুল এর মধ্যে তার হাতের আঙ্গুল এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্য হাতে আরেকজন অফিসার এক ই ভাবে আমার হাতের মুঠোয় হাত ঢুকিয়ে নিয়ে চললেন।
ওরা হয়তো জানে না, আমি পালাবো না। আমার কোন ভয় লাগে নাই। আমি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর আদর্শের অনুসারী। জেল খাটতে আমার বুক কাঁপবে না, একটুও না!
বাসার মেইন সড়কে জিটি স্কুলের সামনে পুলিশের ৩ টা পিক আপ দাড়ানো দেখলাম। আমাকে চোরের মত পেছনে তোলা হলো না। অফিসার আমাকে সম্মান দিলেন। আমাকে ড্রাইভারের পেছনে অফিসার কেবিনে বসতে দেওয়া হলো। এরপর গাড়ি চলতে থাকলো। আমি দুচোখ ভরে আমার বাসা, আমার স্কুল প্রাণভরে দেখলাম গভীর রাতের আলো আঁধারের মাঝখানে।হয়তো অনেক মাস আর দেখতে পাবো না।
যদি ও আমি সংসার বিবাগী হিমু। রাতের দ্বিতীয় প্রহরের এমন সৌন্দর্য আমি অনেক উপলব্ধি করেছি!
রাস্তায় কয়েকটি কুকুরকে শুয়ে থাকতে দেখলাম। জনমানব শূন্য, একজন মানুষ কে ও চোখে পড়লো না। ধীরে ধীরে আমাকে বহনকারী গাড়িটিকে আগে পেছনে আরো দুটি গাড়ি পাহারা দিয়ে থানার দিকে এগিয়ে চললো….
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট





















