দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ—দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হলেও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অভাবে এ খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসআরইএ’র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ লিখিত বক্তব্যে জানান, বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর আরোপ রয়েছে, যা বিনিয়োগে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে প্রচলিত জ্বালানি খাত বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি ও নীতিগত সুবিধা পাচ্ছে, ফলে নীতিগত বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এ সংকটকে তীব্র করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সরকারকে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটির বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। পাকিস্তান, ভারত, ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশগুলো কর অব্যাহতি, কম শুল্ক এবং সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অথচ বাংলাদেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আমদানিতেও উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ থেকে ১২০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন—উভয়ের চাপ একসঙ্গে পড়ছে। বর্তমানে এলএনজি আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ কাতারের ওপর নির্ভরশীল। এদিকে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২,৫০০ এমএমসিএফডি’র বেশি হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে ৮৫০-৯০০ এমএমসিএফডিতে, ফলে ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংকটের প্রভাব শিল্প খাতেও পড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদনশীলতা ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে, যা রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বর্তমান সংকট সাময়িক নয়; এটি দেশের জ্বালানি কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার প্রতিফলন। তাই টেকসই সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর জরুরি।
এ লক্ষ্যে বিএসআরইএ বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ও কর কমানো, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে শূন্য শুল্ক নির্ধারণ, স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং স্থগিত সৌর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন। পাশাপাশি রুফটপ সোলার কর্মসূচি পুনরায় চালু, নেট মিটারিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সৌরচালিত সেচ পাম্প সম্প্রসারণ এবং কর অবকাশ প্রদানেরও আহ্বান জানানো হয়।
বিএসআরইএ’র মতে, যথাযথ নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।



















