ঢাকা ০৯:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ
Logo চীনা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশে চায় ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ Logo লাইপজিগকে হারিয়ে ক্লাসিকো জয়ের অভিযানে নামতে চায় রেয়াল Logo র‍্যাঙ্কিংয়ে শারমিন ও স্বর্ণার উন্নতি Logo ‘পতিত স্বৈরাচার’ ও বিরোধী দল এক হয়ে বিশৃঙ্খলার ষড়যন্ত্র করছে: প্রধানমন্ত্রী Logo রিয়াদে বাসিন্দাদের ফোনে আকাশপথে হামলার সতর্কবার্তা, পরে প্রত্যাহার Logo দুর্গাপূজার সাজপোশাক নিয়ে টিকটকে জনপ্রিয় ৩টি অ্যাকাউন্ট Logo নাঈমের ডাবল সেঞ্চুরি, ১০ ছক্কায় আজিজুল ১৪২, ২২ বলের ফিফটিতে জাওয়াদের রেকর্ড Logo অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা নয় Logo আখচাষীদের ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী Logo আমেরিকা কি সত্যি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের পথে যাচ্ছে?

ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য: অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য কেবল একটি ভাষার স্বীকৃতি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছিল বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ ও আত্মমর্যাদার সংগ্রাম। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলা উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত বাঙালির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসমাজের আত্মত্যাগ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা আদায়ের আন্দোলনকে অনিবার্য করে তোলে। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়, যা ছিল এই সংগ্রামের প্রথম বড় সাফল্য।

ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো, এটি বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি নির্মাণ করে। ভাষার প্রশ্নে যে ঐক্য ও প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল, তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, সব কিছুর বীজ নিহিত ছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই। কারণ ভাষা ছিল বাঙালির পরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু। ভাষাকে রক্ষা করার মধ্য দিয়েই বাঙালি বুঝতে পারে যে নিজেদের অধিকার রক্ষায় সংগ্রামই একমাত্র পথ।

ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে শিখিয়েছিল সংগঠিত প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে অধিকার আদায় সম্ভব। এটি ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণভিত্তিক ও প্রগতিশীল আন্দোলন, যা ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের ভেতরে সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলে। সেই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে। তাই বলা যায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের যে শক্তি, সাহস ও আত্মবিশ্বাস, তার মূল উৎস ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা ভাষা আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী মর্যাদা দেয়। ফলে ভাষা আন্দোলন শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস নয়, বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে। সর্বোপরি, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর যার ওপর দাঁড়িয়েই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশকে অর্জন করেছি।

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
পরিচালক, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জনপ্রিয়

চীনা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশে চায় ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’

ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য: অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা

প্রকাশিত ০৬:১৮:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য কেবল একটি ভাষার স্বীকৃতি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছিল বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ ও আত্মমর্যাদার সংগ্রাম। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলা উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত বাঙালির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসমাজের আত্মত্যাগ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা আদায়ের আন্দোলনকে অনিবার্য করে তোলে। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়, যা ছিল এই সংগ্রামের প্রথম বড় সাফল্য।

ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো, এটি বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি নির্মাণ করে। ভাষার প্রশ্নে যে ঐক্য ও প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল, তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, সব কিছুর বীজ নিহিত ছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই। কারণ ভাষা ছিল বাঙালির পরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু। ভাষাকে রক্ষা করার মধ্য দিয়েই বাঙালি বুঝতে পারে যে নিজেদের অধিকার রক্ষায় সংগ্রামই একমাত্র পথ।

ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে শিখিয়েছিল সংগঠিত প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে অধিকার আদায় সম্ভব। এটি ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণভিত্তিক ও প্রগতিশীল আন্দোলন, যা ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের ভেতরে সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলে। সেই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে। তাই বলা যায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের যে শক্তি, সাহস ও আত্মবিশ্বাস, তার মূল উৎস ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা ভাষা আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী মর্যাদা দেয়। ফলে ভাষা আন্দোলন শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস নয়, বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে। সর্বোপরি, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর যার ওপর দাঁড়িয়েই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশকে অর্জন করেছি।

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
পরিচালক, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়