ঋতুচক্রের নিয়মে বাংলাদেশে প্রতি বছর বসন্ত আসে। শিমুল-পাতার লালে, কৃষ্ণচূড়ার অগ্নিরঙে, কোকিলের ডাকে প্রকৃতি নতুন করে জীবনের গান শোনায়। কিন্তু এই দেশের রাজনীতির আকাশে যেন বসন্তের আগমন ঘটে না। সেখানে ঋতুর নাম ক্ষমতা, আবহাওয়ার নাম প্রতিশোধ, আর জলবায়ুর নাম অনিশ্চয়তা।
স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে এলেও আমাদের রাজনীতি এখনো পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নাগাল পায়নি। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বহুবার; পাল্টেছে স্লোগান, প্রতীক, এমনকি রাজনৈতিক মিত্রও। কিন্তু খুব একটা বদলায়নি রাজনৈতিক আচরণের চরিত্র। বিরোধী দলে থাকলে গণতন্ত্রের ভাষা উচ্চারিত হয়, আর ক্ষমতায় গেলে সেই ভাষা অনেক সময়ই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অভিধানে হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতের লড়াইয়ের চেয়ে মানুষ বেশি দেখেছে ব্যক্তি-সংঘাতের ইতিহাস। আদর্শের চেয়ে আনুগত্য, নীতির চেয়ে কৌশল, রাষ্ট্রের চেয়ে দলের স্বার্থ—এসবই যেন ক্রমে রাজনীতির প্রধান পরিচয় হয়ে উঠেছে। ফলে জনগণ ভোট দেয়, কিন্তু অনেক সময় রাজনীতির মালিক হতে পারে না; রাষ্ট্র তাদের হলেও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে তারা থাকে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এ দেশে রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সেই মানুষ, যার কোনো রাজনৈতিক পদ নেই। একজন কৃষক, একজন শ্রমিক, একজন শিক্ষক, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবী—যাদের একমাত্র চাওয়া নিরাপদ জীবন, ন্যায্য সুযোগ আর সম্মানজনক ভবিষ্যৎ। অথচ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিটি ঢেউ প্রথমে আঘাত হানে তাদের জীবনেই।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, প্রায়ই শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। ফলে সংলাপের টেবিলের বদলে সংঘাতের মঞ্চ বড় হয়, সমঝোতার ভাষা হারিয়ে যায়, আর রাষ্ট্র ক্রমশ বিভক্তির ভার বহন করতে থাকে।
কিন্তু ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। প্রতিটি দীর্ঘ শীতের পর যেমন বসন্ত আসে, তেমনি প্রতিটি রাজনৈতিক অন্ধকারও একদিন শেষ হতে পারে। তবে সেই বসন্ত কোনো একক নেতা, দল বা নির্বাচনের মাধ্যমে আসবে না; আসবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের মাধ্যমে। যখন ক্ষমতা হবে জনগণের আস্থা রক্ষার দায়িত্ব, প্রতিশোধের অস্ত্র নয়; যখন বিরোধিতা হবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, নীতির পক্ষে; যখন গণতন্ত্র কেবল ভোটের বাক্সে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও জবাবদিহির সংস্কৃতিতে রূপ নেবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো স্লোগান নয়, নতুন কোনো মুখও নয়। প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক দর্শন, যেখানে ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু রাষ্ট্র স্থায়ী; দল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দেশ তারও ঊর্ধ্বে; আর জনগণ কেবল ভোটার নয়, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।
সেদিনই হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিকারের বসন্ত আসবে। তার আগে পর্যন্ত আমাদের রাজনীতি—ক্ষমতার ঋতুচক্রে ঘুরে ফিরে—একটি চির বসন্তহীন ঋতুর নাম হয়েই থাকবে।





























