জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ফোন করে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে একটি প্রতারক চক্র। জুলাই মাসে একই কৌশলে সংঘটিত তিনটি প্রতারণার ঘটনা সামনে আসায় শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, ২৯ জুলাই ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের মিডটার্ম পরীক্ষা চলাকালে নিয়ম অনুযায়ী এক শিক্ষার্থী তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ রাখেন। এ সুযোগে প্রতারক চক্রটি তাঁর বাবার কাছে ফোন করে নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে দাবি করে, তাঁর ছেলেকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে। পরে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে বিকাশের মাধ্যমে ওই অভিভাবকের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় তারা।
ঘটনার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর তরিকুল ইসলাম জনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে জানিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
এর একদিন পর, ৩০ জুলাই আবারও একই কৌশলে প্রতারণার চেষ্টা চালায় চক্রটি। এবার এক নারী শিক্ষার্থীর মাকে ফোন করে নিজেদের ডিবি পুলিশের কর্মকর্তা পরিচয় দেয় তারা। ফোনে বলা হয়, তাঁর মেয়েকে একটি আবাসিক হোটেল থেকে আটক করা হয়েছে। পরে সামাজিক সম্মানহানির ভয় দেখিয়ে এবং ফোনের অপর প্রান্তে এক নারীর কান্নার শব্দ শোনানোর মাধ্যমে ঘটনাটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়।
তবে আগের দিনের ঘটনার বিষয়ে জানার কারণে ওই অভিভাবক তাৎক্ষণিকভাবে টাকা পাঠাননি। তিনি পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি যাচাই করেন। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পান।
এ ছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, গত ৭ জুলাই তাঁর পরিবারের সঙ্গেও একই ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটেছিল। তিনি বলেন, প্রতারক চক্রটি তাঁর বাবার কাছে ফোন করে নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে দাবি করে, তাঁকে গাঁজাসহ আটক করা হয়েছে। বিষয়টি মীমাংসার কথা বলে দ্রুত দুই হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে চাপ দেওয়া হয়। ছেলের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে আতঙ্কিত হয়ে তাঁর বাবা প্রতারকদের দেওয়া নম্বরে দুই হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। পরে শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি জানতে পারেন, পুরো ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত প্রতারণা।
এই তিনটি ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে নিজেদের পরিবার, স্বজন ও পরিচিতদের এ ধরনের ফোনকল সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে প্রতারকেরা কীভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য, অভিভাবকদের ফোন নম্বর কিংবা পরীক্ষার সময়সূচি সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের একাংশের আশঙ্কা, কোথাও থেকে তথ্য ফাঁস হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর তরিকুল ইসলাম জনি বলেন, “অপরিচিত নম্বর থেকে এ ধরনের ফোন এলে কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। টাকা পাঠানোর আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, তাঁর সহপাঠী, বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, প্রতারণার শিকার হওয়া প্রথম অভিভাবক ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কোনো সন্দেহজনক ফোনকল পেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।





















