২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ঝরে যাওয়া কোনো সময় নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, রাজনৈতিক বঞ্চনা আর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সাধারণ জনতার আত্মপ্রত্যয়ের এক অভূতপূর্ব পুনর্জাগরণ দেখেছিল জাতি। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ক্ষণে গণভবনে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রবেশ কেবল একটি ক্ষমতার পটপরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থার চরম সংকটে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার এক সম্মিলিত সাহসের গল্প।
জনরোষ ও গণবিক্ষোভের মুখে ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের ঘটনাকে নিছক একটি সরকারের পতন হিসেবে মূল্যায়ন করলে এর ঐতিহাসিক বিশালতা ঢাকা পড়ে যায়। এই গণবিস্ফোরণের নেপথ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অবদমিত নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য, তরুণ প্রজন্মের তীব্র হতাশা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে মানুষের ক্রমহ্রাসমান আস্থার এক গভীর ক্ষত লুকিয়ে ছিল।
একটি রাষ্ট্র তখনই তার আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়, যখন জনগণ অনুধাবন করে তাদের মতামতের মূল্য রয়েছে এবং ভোটাধিকার কার্যকর। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলোর অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতা দেশের রাজনৈতিক ভিত্তিকে চরমভাবে দুর্বল করে দেয়।
শুধু নির্বাচনই নয়, স্বাধীন মতপ্রকাশ, গণমাধ্যমের অবাধ বিচরণ এবং বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শকে ক্রমাগত সংকুচিত করার ফলে এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনের যথেচ্ছ প্রয়োগে সাংবাদিক, লেখক ও মানবাধিকারকর্মীদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ভিন্নমতকে যেখানে রাষ্ট্রের সৌন্দর্য হিসেবে দেখা হয়, সেখানে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে বিবেচনা করার চর্চা গোটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুম, খুন ও নিখোঁজের ঘটনাগুলো ছিল সবচেয়ে বীভৎস ও হৃদয়বিদারক। ‘আয়নাঘর’-এর মতো কথিত গোপন বন্দিশালার অস্তিত্ব জনমনে কেবল তীব্র আতঙ্কই ছড়ায়নি, বরং রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে তলানিতে নিয়ে ঠেকায়। বছরের পর বছর প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর কান্না প্রমাণ করেছে, জবাবদিহিহীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কীভাবে একটি আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রের মূলভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়।
রাজনৈতিক এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্য সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছিল। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের আকাল, ব্যাংকিং খাতে লুটপাট, অর্থপাচার এবং পাহাড়সম দুর্নীতির কারণে সমাজে বৈষম্যের এক বিভীষিকাময় চিত্র তৈরি হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সাধারণ মানুষের যখন নাভিশ্বাস উঠছিল, ঠিক তখনই কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির খবর জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের একটি নিরীহ ও যৌক্তিক দাবি থেকেই মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ওপর রাষ্ট্রের নির্মম দমনপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ সেই স্ফুলিঙ্গকে দাবানলে পরিণত করে। অধিকার আদায়ের এই লড়াই দ্রুতই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নাগরিক মুক্তির আন্দোলনে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ছাত্র, তরুণ, পেশাজীবী থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণ এই গণজাগরণে একাত্ম হয়ে রাজপথে নেমে আসে।
এই অভ্যুত্থানের প্রতিটি পাতায় জড়িয়ে আছে অগণিত শহীদের রক্ত। রংপুরে আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া অকুতোভয় আত্মদান পুরো বাংলাদেশকে স্তব্ধ ও আলোড়িত করেছিল। এরপর মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান ফাইয়াজদের মতো অসংখ্য তরুণের তাজা প্রাণ ঝরে পড়া এই আন্দোলনকে এনে দেয় সর্বজনীন স্বীকৃতি। তাঁদের এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ আজ বাংলার ঘরে ঘরে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের এক চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রক্ষমতার কর্তাদের একটি ধ্রুব সত্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—জনগণই রাষ্ট্রের শক্তির মূল উৎস এবং জনমতকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা অসম্ভব। তবে স্বৈরশাসনের পতনই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় নয়। বরং একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটি শুরু হয় এই পতনের পর মুহূর্ত থেকেই।
জুলাইয়ের গণজাগরণের অন্তর্নিহিত বার্তাটি ছিল একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়া। এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে কোনো নাগরিক তার রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্ম, মত বা ভাষার কারণে বৈষম্যের শিকার হবেন না। যেখানে নাগরিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে তার সাংবিধানিক অধিকার এবং যেখানে আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর থাকবে।
এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী ও সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা, নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম যেন কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় না পেয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া বা ‘মব জাস্টিস’-এর প্রবণতা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। একটি আইনের শাসনের দেশে এটি কখনোই কাম্য হতে পারে না। অপরাধীর বিচার কেবল আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতেই হতে হবে। প্রতিশোধ বা অন্ধ জনরোষ কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না; বরং এটি রাষ্ট্রকেই ভেতর থেকে দুর্বল ও নৈরাজ্যকর করে তোলে।
জুলাই-আগস্টের শহীদদের স্মরণ করা মানে কেবল শোক পালন করা নয়; তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে অবিলম্বে কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার প্রয়োজন। ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা রক্ষা, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ বিচার, দুর্নীতি দমন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনার বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
একই সঙ্গে, পরিবর্তনের এই রক্তাক্ত রূপরেখা যারা এঁকেছে, সেই তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সুরক্ষিত ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা রাষ্ট্রের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণাধর্মী উদ্ভাবনী পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করে—স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানো যতটা কঠিন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা তার চেয়েও ঢের বেশি কঠিন। ব্যক্তিপূজার বদলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে না পারলে অতীতের সেই অশুভ ছায়া ভিন্ন কোনো রূপে আবারও ফিরে আসতে পারে। তাই আগামী বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিরঙ্কুশ আইনের শাসন।
জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল ও রক্তাক্ত দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। আজ গণঅভ্যুত্থান দিবসে শহীদদের প্রতি আমাদের সবচেয়ে অর্থবহ শ্রদ্ধাঞ্জলি হতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে ভয় দেখাবে না, বরং নিরাপত্তা দেবে। যেখানে সরকার সমালোচনাকে শত্রুতা না ভেবে গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে; বিচার হবে আইনের মানদণ্ডে, ক্ষমতার অঙ্গুলিহেলনে নয়। আর কোনো তরুণকে যেন অধিকারের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে না হয়—রক্তের এই ঋণ কেবল তখনই শোধ হবে, যখন একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকার বাস্তবে পূর্ণতা পাবে।






































