দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে অবস্থিত হাবিপ্রবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম মিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দিনাজপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কয়েকজন অভিভাবক।
গত ১২ মে ১৯ জন অভিভাবকের স্বাক্ষরসংবলিত একটি অভিযোগপত্র জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
অভিযোগপত্রে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষার্থী ভর্তির সময় ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়, বিদ্যালয় চলাকালীন কোচিং করানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রতি মাসে ৫০ টাকা আদায়, বিদ্যালয়ের নিজস্ব লাইব্রেরি থেকে বই কিনতে বাধ্য করা, সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়া, শিশু শ্রেণির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের অনিয়ম, সরকার প্রদত্ত ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু না করা এবং অন্য শিক্ষকদের তা চালু করতে না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া ক্লাসে পাঠদান না করিয়ে আগের দিন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যাওয়া, চারু ও কারুকলা পরীক্ষার দিন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ঝাড়ু, হারপিক ও সাবান নেওয়া এবং উপবৃত্তি প্রদানে অনিয়ম ও টাকা দাবির অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রধান শিক্ষক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রায়ই অশোভন আচরণ করেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তিনি ‘আমার কেউ কিছু করতে পারবে না, আমার ওপরে সবাইকে ম্যানেজ করা আছে’—এমন কথা বলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভুয়া। প্রাথমিক শাখায় প্রায় ১৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু অভিযোগপত্রে মাত্র ১৯ জন অভিভাবকের স্বাক্ষর রয়েছে। বাকি ১২১ জন অভিভাবক কেন স্বাক্ষর করেননি, সেটিও জানা দরকার।”
অভিযোগপত্রে জাল স্বাক্ষর রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। প্রধান শিক্ষক বলেন, “কিছু অভিভাবক আমাকে জানিয়েছেন, গাছের চারা দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।”
তবে অভিযোগপত্রে থাকা স্বাক্ষর যাচাইয়ের বিষয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে হাবিপ্রবির একজন অধ্যাপকের স্বাক্ষর ও মোবাইল নম্বর রয়েছে। ওই অধ্যাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এটি জাল স্বাক্ষর হতে পারে।”
অন্যদিকে, অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করা কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা দাবি করেন।
এক অভিভাবক বলেন, “আমার দুই সন্তান ওই স্কুলে পড়ে। বেশিরভাগ অভিযোগই সত্য। চাইলে এসে সরেজমিনে যাচাই করতে পারেন। স্কুলের টয়লেট থেকে ছোট ছোট সাপ বের হয়। বাচ্চারা সেখানে কীভাবে টয়লেট করবে? আমরা জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছেও গিয়েছিলাম। আমার মেয়ে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছে, সেই পরীক্ষার জন্য টাকা চাওয়া হয়েছে, কিন্তু রশিদ দেওয়া হয়নি।”
আরেক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, “আমার ছেলে ওই স্কুলে পড়ে। তার বড় বোনও পাঁচ বছর প্রাথমিকের ওই স্কুলে পড়েছে। তখন যে অবস্থা ছিল, এখন তার চেয়েও খারাপ হয়েছে।”
অভিভাবকদের অভিযোগের পর হাবিপ্রবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে তদন্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তারা বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ATEO) সানজিদা শারমিন বলেন, “তদন্তের রিপোর্ট আপনারা অচিরেই পাবেন। আমাদের যে তদন্ত কর্মকর্তারা গিয়েছিলেন, তারা টিওকে রিপোর্ট দিয়েছেন। টিও হয়তো সামনে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। ওই স্কুলটি আমার তত্ত্বাবধানে রয়েছে।”
সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ATEO) চৈতন্য কুমার রায় বলেন, “আমরা সেখানে তদন্ত করেছি এবং তদন্তের রিপোর্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।”
দিনাজপুরের সাবেক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহজাহান সিদ্দিক বর্তমানে রংপুরে কর্মরত। তিনি বলেন, “গত মাসের ২৪ তারিখে দিনাজপুরে আমার শেষ কর্মদিবস ছিল। বর্তমানে রংপুরে কর্মরত আছি। আমি আসার সময় তদন্তটি দিনাজপুরের টিওকে দিয়ে এসেছি। তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তদন্ত প্রতিবেদনটি আমি পাইনি। এখন আমার আসার ২০ দিন হয়ে গেছে। তাই এ বিষয়ে এখন আমি কিছু বলতে পারছি না। তবে তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি শক্তভাবে দেখার জন্য বর্তমান টিও আবুল কালামকে বলেছি।”
এ বিষয়ে দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালামের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, “এটার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রিপোর্ট আমাদের কাছে আসছে। আমরা ব্যবস্থা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে শিগগিরই পাঠানোর ব্যবস্থা করব। আমার কাছে রিপোর্ট জমা হয়েছে দুই-তিন দিন হলো। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পরই অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।
































