একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজস্ব হাসপাতাল থাকা সবচেয়ে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ চিকিৎসা বিদ্যায় পাঠ্যপুস্তকের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষার প্রধান ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করে এই চিকিৎসালয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে বর্তমানে ১২টিরই নিজস্ব কোনো হাসপাতাল নেই। ফলে শত শত শিক্ষার্থীকে তাদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন জেলা সদর বা জেনারেল হাসপাতালের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। কলেজ থেকে এসব হাসপাতালের দূরত্ব অনেক সময় কয়েক কিলোমিটার হওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াত করতে গিয়েও নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী পাবনা নোয়াখালী ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৮ সালে এবং পরবর্তী সময়ে যশোর ও জামালপুর কলেজ যুক্ত হলেও এদের নিজস্ব হাসপাতাল আজও গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে রাঙামাটি হবিগঞ্জ নীলফামারী নেত্রকোনা নওগাঁ মাগুরা এবং চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের নিজস্ব কোনো স্থায়ী একাডেমিক ভবন কিংবা হাসপাতাল কোনোটিই নেই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর থাকায় নির্ধারিত সময়ে তার এক-তৃতীয়াংশ কাজও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে শিক্ষার্থী ভর্তির পর ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের যে প্রাথমিক তাগিদ তৈরি হয় তা এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলা সদর বা জেনারেল হাসপাতালগুলো মূলত মাধ্যমিক পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে যেখানে জটিল রোগী শয্যা পর্যাপ্ত অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা এবং বিশেষায়িত বিভাগের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা মো সাইফুল ইসলাম সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তাদের শিক্ষার্থীদের প্রায় দশ কিলোমিটার দূরের জেনারেল হাসপাতালে ক্লাস করতে হয় যা যাতায়াতের দিক থেকে বেশ সময়সাপেক্ষ। এছাড়া এসব হাসপাতালে বৈচিত্র্যময় জটিল কেস ও উন্নত ব্যবস্থাপনা না থাকায় শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা প্রীতি প্রসূন বড়ুয়াও জানান যে তাদের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম জেনারেল হাসপাতালের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছে যদিও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
চিকিৎসা শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশন বা ডব্লিউএফএমই পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল টিচিং সুবিধার ওপর সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা মোজাহেরুল হক মনে করেন হাসপাতালের ঘাটতি থাকার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অন্যদের তুলনায় কম দক্ষতা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। এর ফলে চিকিৎসকদের পেশাগত মানের ক্ষেত্রে একধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের মানদণ্ড অনুযায়ীও ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল মূলত তৃতীয় পর্যায়ের বা বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে যেখানে জটিল রোগের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয়। হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের মতো নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও জেলা হাসপাতালের কয়েকটি কক্ষে পাঠদান ও দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এই সংকট শুধু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকেই ব্যাহত করছে না বরং এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষও উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই চিকিৎসা শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে দ্রুত এসব মেডিকেল কলেজের নিজস্ব আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।





































