শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিতে বিভিন্ন কার্যক্রমে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের একটি দল সেখানে তদন্ত চালিয়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক নানা ত্রুটি চিহ্নিত করেছে। শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে হোস্টেল পরিচালনা, কেনাকাটা এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অস্বচ্ছতা দেখতে পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গত কয়েক বছর ধরে চলা এসব অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। নিয়মানুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষাখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সাম্প্রতিক এসব অনিয়ম এর কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের আট সদস্যের একটি দল সম্প্রতি নায়েমে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই তদন্ত পরিচালনা করে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচটি অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি হোস্টেল থেকে ১২ কোটিরও বেশি টাকা আয় হলেও তার বিপরীতে কোনো স্টক রেজিস্টার বা সঠিক বিল-ভাউচার সংরক্ষণ করা হয়নি। হোস্টেলগুলোর আয় থেকে ব্যয় বাদ দেওয়ার পর থাকা প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এছাড়া নায়েমের জমিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দোকান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গত ১১ বছরের বকেয়া ভাড়ার বড় একটি অংশও জমা নেওয়া হয়নি। তদন্ত দল সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বকেয়া এসব অর্থ দ্রুত সরকারি তহবিলে জমা দেওয়ার কড়া সুপারিশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ক্যাফেটেরিয়া, লন্ড্রি ও সেলুনের মতো বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোর ভাড়ার ক্ষেত্রেও চরম প্রশাসনিক উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে প্রাতিষ্ঠানিক কেনাকাটা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আর্থিক বিধিমালা লঙ্ঘনের চিত্রও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারি বরাদ্দ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পিপিআর বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে একচেটিয়া কাজ দেওয়া হয়। বিশেষ করে ইনডাকশন ট্রেনিং কোর্সের গাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রমাণ মিলেছে, যা সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। প্রশিক্ষণের নামে অর্থ ও সময়ের অপচয় রোধ করতে মডিউলগুলো আরও বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ২৬ ধরনের প্রশিক্ষণের মডিউলে ব্যাপক ফারাক রয়েছে এবং এগুলো সুচিন্তিতভাবে তৈরি করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে নায়েমের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. ওয়াসীম মো. মেজবাহুল হক গণমাধ্যমকে জানান যে তিনি তখনও প্রতিবেদনটি হাতে পাননি, তাই এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মো. আফলাতুন নিশ্চিত করেছেন যে নিয়ম মেনেই তদন্ত শেষে প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং এখন কর্তৃপক্ষ বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
প্রতিবেদনের শেষ পর্যায়ে নায়েমের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির স্বার্থে বেশ কিছু যুগান্তকারী সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকার বর্তমান স্থান থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বাইরে কোনো প্রশস্ত ও পরিকল্পিত স্থানে স্থানান্তরিত করা। ঢাকার অভ্যন্তরে জায়গার স্বল্পতা এবং বর্তমান অবকাঠামোর নানা সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেই এই স্থানান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষাখাদের মান উন্নয়ন ও কর্মকর্তাদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে নায়েমের সার্বিক কার্যক্রমে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেটাই দেখার বিষয়। শিক্ষা খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।




































