সাহিত্য ডেস্ক: কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ। চৌদ্দ অক্টোবর সংঘটিত এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর শরীর মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয় এবং দীর্ঘ আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে বাইশে অক্টোবর রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবনানন্দের এই প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য হারায় এক অনন্য প্রতিভাধর স্রষ্টাকে, যিনি জীবদ্দশায় আমৃত্যু নির্জনতা ও আত্মানুসন্ধানে বিশ্বাসী ছিলেন।
দুর্ঘটনার পর গুরুতর জখম অবস্থায় কবিকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানে তাঁর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন সমালোচক সজনীকান্ত দাস এবং মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের হস্তক্ষেপে কবির মৃতদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই সৎকার করা হয়। হাসপাতালের দিনগুলোতে কবি শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি প্রিয়জনদের দূরত্বও অনুভব করেন, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী লাবণ্য দাশ শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করে দেন। মৃত্যুর প্রহর গুছিয়ে আসার মুহূর্তেও তিনি ‘ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশজুড়ে’ বলে তাঁর চিরচেনা সাহিত্যিক সত্তার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।
ত্রিশ দশকের পঞ্চপাণ্ডবের অন্যতম এই কবি বাংলা কবিতাকে রবীন্দ্রপ্রভাবের বাইরে এনে সম্পূর্ণ এক স্বতন্ত্র ও আধুনিক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ‘বনলতা সেন’, ‘রূপসী বাংলা’ কিংবা ‘আবার আসিব ফিরে’র মতো অমর সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্কের যে চিত্র এঁকেছেন, তা আজও পাঠকদের মুগ্ধ করে। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে সময়ের অসহায়তা, পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রতি গভীর মমতা এবং এক অচেনা জগতের আকুলতা।
জীবনানন্দের মৃত্যুর পর তাঁর সাহিত্যকর্ম কেবল স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যাদবগঞ্জ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষালয়ের পাঠ্যসূচিতে তাঁর লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর সৃষ্টির আবেদন আরও প্রগাঢ় হয়েছে এবং তাঁর ব্যবহৃত শব্দমালা মিশে গেছে বাংলার ধুলোবালিতে। রক্তমাংসের জীবনানন্দ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি ও দর্শন চিরস্থায়ী হয়ে বেঁচে আছে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে।







































