ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নিপা সম্প্রতি একটি সাক্ষাত্কার অনুষ্ঠানে তার সুদীর্ঘ চার দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার ও জীবনের নানা অজানা দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। অভিনয় ও মডেলিংয়ের যথেষ্ট সুযোগ এবং চলচ্চিত্র থেকে অনেক প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও তিনি শুরু থেকেই নৃত্যশিল্পকে গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। কিশোরগঞ্জের একটি সংস্কৃতিমনা পরিবারে বেড়ে ওঠা এই শিল্পীর শৈশবেই নাচ এবং নানা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। পরিবারের উৎসাহ ও নিজ সাধনার জোরে তিনি নিজেকে কেবল একজন সফল নৃত্যশিল্পী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং ধ্রুপদী ও লোকজ নৃত্যের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
নিজের শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশের স্মৃতিচারণ করে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পী জানান, তার চিকিৎসক বাবাকে দেখে একসময় তারও ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা জেগেছিল কিন্তু চারপাশের সাংস্কৃতিক আবহ তাকে ক্রমেই নাচের দিকে টানে। সতীর্থ নৃত্যশিল্পী শিবলী মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘নৃত্যাঞ্চল’ নামের একটি নৃত্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে নিয়মিতভাবে নতুন প্রজন্মের নৃত্যশিল্পীরা তৈরি হয়ে বের হচ্ছেন। তবে নাচকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অতীতে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তখনকার সময়ে নৃত্যশিল্পকে একক পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র বা অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ছিল না বললেই চলে।
অনুষ্ঠানে কথা বলতে গিয়ে এই নৃত্যশিল্পী বর্তমান সমাজের নৃত্যচর্চার করুণ দশা ও উপযুক্ত জায়গার অভাব নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি আক্ষেপের সুরে প্রশ্ন তোলেন যে ছেলেমেয়েরা নাচ শিখে শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে কারণ দেশে চর্চা বা পারফর্ম করার মতো পর্যাপ্ত জায়গার অভাব রয়েছে। কেবল নামকরা তারকা বা খ্যাতি অর্জনের মোহে তিনি এই অঙ্গনে আসেননি বরং সাধনার মধ্য দিয়ে একজন ভালো মানের শিল্পী হয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করে গেছেন। দীর্ঘ পথচলায় দর্শকের ভালোবাসার পাশাপাশি তাকে কাজ করতে গিয়ে বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
কাজের প্রতি চরম নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলার কথা বলতে গিয়ে শামীম আরা নিপা জানান, পর্দার পেছনের মানুষ হিসেবে তাকে প্রায়শই কঠোর বলে মনে করেন তার শিক্ষার্থীরা। অনুশীলনের সময় নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখতে তিনি কখনো কখনো কঠোর অবস্থান নেন কারণ কাজটা নিখুঁত করার জন্য এই কড়াকড়ি জরুরি বলে তিনি বিশ্বাস করেন। শিক্ষার্থীরা তাকে রাগী ভাবলেও তিনি তাতে পরোয়া করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়। নানামুখী প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে শুধু নাচকে ভালোবেসে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে তার শৈশবের পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিল্পচর্চার প্রতি নিখাদ একাগ্রতা।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নৃত্য সাধনায় ব্রতী থাকা এই শিল্পীর মতে, শিল্পচর্চায় কখনো পুরোপুরি তৃপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই কারণ একজন সৃজনশীল মানুষের অন্তরে আরও ভালো কিছু করার বাসনা সবসময় কাজ করে। নাচকে কেবল সাধারণ মুগ্ধতা হিসেবে না দেখে তাকে একনিষ্ঠ সাধনা ও শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়। তার এই সুদীর্ঘ পথচলা এবং শিল্পচর্চার প্রতি অটল নিবেদন দেশের নৃত্যশিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। নৃত্যজগতের এই গুণী শিল্পীর জীবনদর্শন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।




































