স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি দমনে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ভেস্তে দিতে বসেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত সচিব মো: কামরুজ্জামান চৌধুরী। বিগত সরকারের আমলে ১৭ বছর বঞ্চিত বা ‘উপোস’ থাকার দোহাই দিয়ে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক মেয়াদের সুবিধা নিয়ে তিনি এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, ফ্যাসিস্ট আমলের দোসরদের পুনর্বাসন, বদলি বাণিজ্য এবং বিতর্কিত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সাথে অশুভ আঁতাতের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে তিনি নিজের আয়ের হাতিয়ারে পরিণত করেছেন।
সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী নিজেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধা হিসেবে দাবি করলেও বাস্তবে জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি গুলির নির্দেশদাতা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের রক্ষা ও পুনর্বাসনে মূল ভূমিকা রাখছেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত এবং জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োজিত থাকা উপসচিব সুজিৎ দেবনাথকে প্রশাসন শাখা-১ ও সচিবের বিকল্প পিএস হিসেবে রাখা হয়েছে। একইভাবে আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা উপসচিব স্নেহাশীষকে স্বাস্থ্য-৪ শাখা এবং সিনিয়র সহকারী সচিব খন্দকার রবিউল ইসলামকে প্রশাসন-২ ও ৪ শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুমোদন ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে বিগত আওয়ামী আমলের রংপুর, বগুড়া, বাগেরহাট ও কক্সবাজারের ডিসিদের সুরক্ষা দিয়ে তাদের হাতেই গুরুত্বপূর্ণ নথির দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন সচিব।
স্বাস্থ্য সেক্টরের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও এইচ টি এম এস (HTMS)-এর মালিক আফতাব আহমেদের সাথে সচিবের গোপন সখ্যের খবর এখন পুরো মন্ত্রণালয়ে ওপেন সিক্রেট। অনুসন্ধানে জানা যায়, সচিব হিসেবে যোগদানের পরপরই আফতাবের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা সমমূল্যের ইউরো উপহার গ্রহণ করেন তিনি। এছাড়া রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ইউনিভার্সিটি প্রকল্পের প্যাকেজ-২ এর কাজে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে জাল সনদ ও ভুয়া স্বাক্ষরযুক্ত ‘মজিদ অ্যান্ড সন্স’কে অনৈতিকভাবে কাজ পাইয়ে দিতে গত চার মাস ধরে ফাইল আটকে রেখেছেন তিনি। সময় পেলেই তিনি এই বিতর্কিত ব্যবসায়ীর কার্যালয়ে যাতায়াত করেন এবং তার মাধ্যমেই মন্ত্রণালয়ের বড় অঙ্কের লেনদেন পরিচালিত হয়।
মন্ত্রণালয়ের ‘ডেলিগেশন অব ফিন্যান্সিয়াল পাওয়ার’ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেনাকাটা ও অর্থ পরিশোধের নথি মন্ত্রী পর্যায়ে না পাঠিয়ে নিজেই অনুমোদন দিচ্ছেন সচিব। চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। বনিবনা না হলে পদোন্নতির ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে মাসের পর মাস। সিএমএসডি-সহ বিভিন্ন কেনাকাটা ও হাসপাতালের বিল অনুমোদনের জন্য ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেখানে তার মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন সাবেক সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ও পিএস নাজমুস সাকিব। সচিবের স্বাক্ষরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ৩০ দিন পর্যন্ত আটকে থাকায় স্বাস্থ্য খাতের গতিশীলতা ও চিকিৎসা সেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারের নীতি, স্বচ্ছতা ও সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ানো এসব চরম অনিয়ম এবং ‘বিজনেস অব রুলস’ ভঙ্গের খবর ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌছে গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য স্বাস্থ্য সচিব মো: কামরুজ্জামান চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।






























