গণমাধ্যম ডেস্ক: সম্প্রতি লন্ডনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে দেশের অনলাইন সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করা হয়। ২০০৬ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রথম ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদপত্র এবং চব্বিশ ঘণ্টা সচল বার্তাকক্ষ চালু করেন। সংবাদ পরিবেশনে প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি তিনি সূত্রের নাম উল্লেখ করা এবং কঠোরভাবে সংবাদ যাচাইয়ের মতো পেশাগত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গুজবের পরিবর্তে নির্ভুল ও সত্য খবর প্রকাশের সংস্কৃতি চালুর মধ্য দিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিভিন্ন শাসনামলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার নানা কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মামলা, লাইসেন্স এবং বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে চাপে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের হাতে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা থাকার কারণেও পেশাগত স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এমন প্রতিকূল পরিবেশে খালিদী তার প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনভাবে পেশাদার সাংবাদিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে এই দীর্ঘ পথচলায় তার ভূমিকা নিয়েও নানা মহলে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। কেউ কেউ তাকে সরকারের প্রতি নমনীয় থাকার অভিযোগ করলেও তার কাজের একটি বড় অংশ পেশাদারিত্বের ছাঁচে গড়া ছিল। ২০১৯ সালের শেষ দিকে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি লড়াই শেষে সম্প্রতি সেই মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। স্বাধীন সাংবাদিকতার এই সংগ্রাম প্রমাণ করে যে প্রতিকূল রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও সত্য প্রকাশ করা কতটা দুরূহ।
অমর্ত্য সেনের তত্ত্ব অনুযায়ী, কার্যকর গণতন্ত্র ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রধান শর্ত। ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারের জমানায় মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মতো সংবাদকর্মীরা মুক্ত সংবাদমাধ্যমের লড়াই চালিয়ে গেছেন। তার কাজ ও জীবন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ ও অসমাপ্ত লড়াইয়ের দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।

































