১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেই তৈরি হয়। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে সম্ভাব্য পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন। এর প্রতিবাদে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয় এবং বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। একই বছরের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন “Urdu and only Urdu shall be the State Language of Pakistan”, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে।
১৯৫২ সালে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় এক ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন আবারও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ৩০ জানুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে শহীদ হন। ২২ ফেব্রুয়ারি আবারও গুলিতে শফিউর রহমান শহীদ হন।
এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আন্দোলন দেশব্যাপী বিস্তৃত হয় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়, যা পরে ভেঙে ফেলা হলেও আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবি অন্যতম ইস্যু ছিল এবং অবশেষে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়।
অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়




















