ঢাকা ১১:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

ছয় মাস পর্যটক যাতায়াত বন্ধ: নতুন প্রাণ পেলো সেন্ট মার্টিন

সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকের চেনা কোলাহল নেই। জাহাজঘাটে নেই ভিড়। সৈকতে কেবল বিস্তৃত নীল জলরাশি চোখে পড়ে। সারি সারি নারকেলগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এই দৃশ্য দেখে মনে হলো একখণ্ড স্বর্গ রচিত হয়েছে সাগরের বুকে।

এমন বিচ্ছিন্ন পরিবেশে সেন্ট মার্টিনের প্রকৃতিতে নতুন প্রাণ পেয়েছে। দ্বীপের ছেঁড়াদিয়া, গোলদিয়া ও দিয়ারমাথায় প্রবাল-শৈবাল বিস্তার ঘটছে। শৈবাল ও চুনাপাথরের গায়ে অজস্র শামুক-ঝিনুক আঁকড়ে আছে। বালিয়াড়িতে প্যারাবন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

এখানে এসেই চোখে পড়ল, গত আড়াই বছরে সরকারের কঠোর বিধিনিষেধ আর পর্যটক সীমিতকরণের ফলে দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। কেয়া বনে ঝুলে আছে ফল-ফুল, সৈকতে ভিড় করেছে গাঙচিল, বালুচরে লাল কাঁকড়া আর শামুক-ঝিনুকের বিচরণ। কিন্তু দ্বীপের অন্য চিত্রও রয়েছে। এখানকার পর্যটননির্ভর বাসিন্দাদের বেশির ভাগের জীবনেই বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েছে। পর্যটন মৌসুমে বাড়তি আয় যেমন বন্ধ হয়েছে, তেমনি বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেকেই সাগরে মাছ ধরতে পারছেন না। দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় নেওয়া সরকারের নানা পদক্ষেপে তারা খুশি হলেও বিকল্প আয়ের সংস্থান না হওয়ায় হতাশ। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের লোকসংখ্যা ১০ হাজার ৭০০ জন। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি জেলে, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও খেটে খাওয়া মানুষ।

সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধের মৌসুমে এবং পর্যটকের নিষেধাজ্ঞার সময় হাতে তেমন কাজ থাকে না বলে জানালেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপের স্থানীয় জেলে আবদুল শুক্কুর। তিনি বলেন, এক সময় দ্বীপে পাঁচ মাস পর্যটক থাকতো। সারা বছরই ট্রলারে পর্যটক আসতো। ফলে দোকানদারি করে, ভ্যান চালিয়ে সেই সময় বেশ ভালো আয় হতো। এখন পর্যটক আসা বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে পারছি না।

গত তিন মাস সাগরে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান শুক্কুর। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি অনেক ক্ষোভের কথা বললেন। তার ভাষায়, ‘সরকার বলেছে দ্বীপ বাঁচাতে হবে। আমরা এই দ্বীপের সন্তান, আমরা চাই না দ্বীপটা ধ্বংস হোক। কিন্তু পেটে তো ভাত নেই। সাগরে জাল ফেললেও মাছ ওঠে না। আট সদস্যের সংসার আর চলছে না। কোনো হিসাবই এখন মিলছে না।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের যাতায়াত সীমিত করে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ মাস অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে দৈনিক দুই হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ভ্রমণে যেতে পারবেন। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাস পর্যটকরা সেন্ট মার্টিনে রাত যাপন করতে পারবেন, কিন্তু নভেম্বর মাসে রাত যাপনের সুযোগ রাখা হয়নি। দিনে গিয়ে দিনে কক্সবাজার ফিরে আসতে হয়। এ হিসাবে গত দুই মৌসুমে (৬ মাসে) ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেন। তিন বছরে আগে পাঁচ মাস দীর্ঘ মৌসুমে ভ্রমণ করতেন ১০-১৫ লাখ মানুষ।

পরিবেশসংশ্লিষ্ট সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটক সীমিতকরণের প্রভাবে দ্বীপের শ্রেণিপেশার অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। বছরের অবশিষ্ট ৯ মাস দ্বীপের ২৩০টির বেশি হোটেল রিসোর্ট-কটেজ বন্ধ থাকায় ৩ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। চার শতাধিক ইজিবাইক, তিন শতাধিক মোটরসাইকেল ও আড়াই শতাধিক বাইসাইকেল ভাড়া দিয়ে অন্তত ১ হাজার পরিবারের সংসার চলত, পর্যটক না থাকায় সেসব পরিবারও অভাব অনটনের শিকার। কিন্তু এর বিপরীতে দ্বীপের লোকজনের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থাও নেই।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, দ্বীপে পানীয় জলের সংকট নিরসন, বেওয়ারিশ কুকুরের প্রজনন ঠেকাতে বন্ধ্যত্বকরণ প্রকল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ শত কোটি টাকার একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে। আগামী নভেম্বরের আগে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দ্বীপের মানুষের সংকট দূর হবে।

৮ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সেন্ট মার্টিন দ্বীপ সফর করেন। এ সময় দ্বীপের অনেকেই তার কাছে দুর্দশার এই চিত্র তুলে ধরেন। প্রতিমন্ত্রীর কাছে সেন্ট মার্টিন ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ফয়েজুল ইসলাম নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাস দ্বীপে পর্যটকের রাত যাপনের দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অন্তত তিন মাস পর্যটকের রাত যাপনের বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত জানাবেন।

১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সর্বশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সেন্ট মার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ, বিপুল পর্যটকের সমাগম ও যত্রতত্র প্লাস্টিক দূষণের কারণে দ্বীপটি ধ্বংসের মুখে পড়েছিলো। সেন্ট মার্টিনে একসময় প্রবাল, শৈবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শামুক, ঝিনুক, বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, কাঁকড়াসহ প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ছিলো। গত দুই দশকে তার অনেক কিছুই বিলুপ্ত হয়েছে। এ কারণেই সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করে।

সেন্ট মার্টিনে রাতের বেলা সৈকতে আলো জ্বালানোয় নিষেধাজ্ঞা, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি এবং শামুক-ঝিনুক ও প্রবাল আহরণ বন্ধসহ ১২টি নির্দেশনা বাস্তবায়নের ফলে দ্বীপটির প্রকৃতিতে ইতিবাচক অনেক পরিবর্তন এসেছে। দ্বীপের গাছগুলোয় ফল ধরেছে। নতুন চারা গজাচ্ছে। সৈকতে যান্ত্রিক মোটরযানের চলাচল বন্ধ হওয়ায় রাজ কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও শৈবালের বিস্তৃতি বেড়েছে। কেয়াবন ও পাথর স্তূপে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনা বেড়েছে, যা আগে পর্যটকদের চাপে প্রায় অদৃশ্য হয়ে পড়েছিলো। স্থানীয় মানুষ জানায়, পর্যটক সীমিতকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে দ্বীপের পরিবেশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

দ্বীপের পরিবেশ ফেরাতে যে সংস্থাগুলো কাজ করছে তাদের একটি ‘ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি’। এই সংস্থার নির্বাহী কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, পর্যটক কমায় সেন্ট মার্টিনে মা কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ ফিরে এসেছে। প্রথম বছরে ৩ হাজার এবং দ্বিতীয় বছরে ৭ হাজারের বেশি কাছিমের ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচারিতে বাচ্চা উৎপাদন করে সাগরে অবমুক্ত করা হয়েছে। আগে কাছিমের ডিম বেওয়ারিশ কুকুর খেয়ে ফেলত। এখন অভুক্ত তিন হাজার কুকুরকে দিনে একবেলা করে খাবার সরবরাহ করছে একটি বেসরকারি সংস্থা। ফলে কাছিমের ডিম সুরক্ষা পাচ্ছে।

‘সেন্ট মার্টিনের দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’ নামে ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের কাজ চলছে দ্বীপটিতে। এ প্রকল্পের পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, দ্বীপের ছেঁড়াদিয়া, গোলদিয়া ও দিয়ারমাথায় প্রবাল-শৈবাল বিস্তার ঘটছে। শৈবাল ও চুনাপাথরের গায়ে অজস্র শামুক-ঝিনুক আঁকড়ে আছে। বালিয়াড়িতে প্যারাবন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। প্যারাবনে ব্যাঙ, সাপ, টিকটিকি, প্রজাপতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণ বাড়ছে, যা তিন বছর আগে ছিলো না।

জনপ্রিয়

নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যানি, সালাহউদ্দিন আহমেদ এলজিআরডি মন্ত্রী!

ছয় মাস পর্যটক যাতায়াত বন্ধ: নতুন প্রাণ পেলো সেন্ট মার্টিন

প্রকাশিত ০৪:১৯:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকের চেনা কোলাহল নেই। জাহাজঘাটে নেই ভিড়। সৈকতে কেবল বিস্তৃত নীল জলরাশি চোখে পড়ে। সারি সারি নারকেলগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এই দৃশ্য দেখে মনে হলো একখণ্ড স্বর্গ রচিত হয়েছে সাগরের বুকে।

এমন বিচ্ছিন্ন পরিবেশে সেন্ট মার্টিনের প্রকৃতিতে নতুন প্রাণ পেয়েছে। দ্বীপের ছেঁড়াদিয়া, গোলদিয়া ও দিয়ারমাথায় প্রবাল-শৈবাল বিস্তার ঘটছে। শৈবাল ও চুনাপাথরের গায়ে অজস্র শামুক-ঝিনুক আঁকড়ে আছে। বালিয়াড়িতে প্যারাবন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

এখানে এসেই চোখে পড়ল, গত আড়াই বছরে সরকারের কঠোর বিধিনিষেধ আর পর্যটক সীমিতকরণের ফলে দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। কেয়া বনে ঝুলে আছে ফল-ফুল, সৈকতে ভিড় করেছে গাঙচিল, বালুচরে লাল কাঁকড়া আর শামুক-ঝিনুকের বিচরণ। কিন্তু দ্বীপের অন্য চিত্রও রয়েছে। এখানকার পর্যটননির্ভর বাসিন্দাদের বেশির ভাগের জীবনেই বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েছে। পর্যটন মৌসুমে বাড়তি আয় যেমন বন্ধ হয়েছে, তেমনি বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেকেই সাগরে মাছ ধরতে পারছেন না। দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় নেওয়া সরকারের নানা পদক্ষেপে তারা খুশি হলেও বিকল্প আয়ের সংস্থান না হওয়ায় হতাশ। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের লোকসংখ্যা ১০ হাজার ৭০০ জন। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি জেলে, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও খেটে খাওয়া মানুষ।

সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধের মৌসুমে এবং পর্যটকের নিষেধাজ্ঞার সময় হাতে তেমন কাজ থাকে না বলে জানালেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপের স্থানীয় জেলে আবদুল শুক্কুর। তিনি বলেন, এক সময় দ্বীপে পাঁচ মাস পর্যটক থাকতো। সারা বছরই ট্রলারে পর্যটক আসতো। ফলে দোকানদারি করে, ভ্যান চালিয়ে সেই সময় বেশ ভালো আয় হতো। এখন পর্যটক আসা বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে পারছি না।

গত তিন মাস সাগরে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান শুক্কুর। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি অনেক ক্ষোভের কথা বললেন। তার ভাষায়, ‘সরকার বলেছে দ্বীপ বাঁচাতে হবে। আমরা এই দ্বীপের সন্তান, আমরা চাই না দ্বীপটা ধ্বংস হোক। কিন্তু পেটে তো ভাত নেই। সাগরে জাল ফেললেও মাছ ওঠে না। আট সদস্যের সংসার আর চলছে না। কোনো হিসাবই এখন মিলছে না।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের যাতায়াত সীমিত করে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ মাস অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে দৈনিক দুই হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ভ্রমণে যেতে পারবেন। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাস পর্যটকরা সেন্ট মার্টিনে রাত যাপন করতে পারবেন, কিন্তু নভেম্বর মাসে রাত যাপনের সুযোগ রাখা হয়নি। দিনে গিয়ে দিনে কক্সবাজার ফিরে আসতে হয়। এ হিসাবে গত দুই মৌসুমে (৬ মাসে) ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেন। তিন বছরে আগে পাঁচ মাস দীর্ঘ মৌসুমে ভ্রমণ করতেন ১০-১৫ লাখ মানুষ।

পরিবেশসংশ্লিষ্ট সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটক সীমিতকরণের প্রভাবে দ্বীপের শ্রেণিপেশার অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। বছরের অবশিষ্ট ৯ মাস দ্বীপের ২৩০টির বেশি হোটেল রিসোর্ট-কটেজ বন্ধ থাকায় ৩ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। চার শতাধিক ইজিবাইক, তিন শতাধিক মোটরসাইকেল ও আড়াই শতাধিক বাইসাইকেল ভাড়া দিয়ে অন্তত ১ হাজার পরিবারের সংসার চলত, পর্যটক না থাকায় সেসব পরিবারও অভাব অনটনের শিকার। কিন্তু এর বিপরীতে দ্বীপের লোকজনের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থাও নেই।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, দ্বীপে পানীয় জলের সংকট নিরসন, বেওয়ারিশ কুকুরের প্রজনন ঠেকাতে বন্ধ্যত্বকরণ প্রকল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ শত কোটি টাকার একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে। আগামী নভেম্বরের আগে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দ্বীপের মানুষের সংকট দূর হবে।

৮ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সেন্ট মার্টিন দ্বীপ সফর করেন। এ সময় দ্বীপের অনেকেই তার কাছে দুর্দশার এই চিত্র তুলে ধরেন। প্রতিমন্ত্রীর কাছে সেন্ট মার্টিন ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ফয়েজুল ইসলাম নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাস দ্বীপে পর্যটকের রাত যাপনের দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অন্তত তিন মাস পর্যটকের রাত যাপনের বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত জানাবেন।

১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সর্বশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সেন্ট মার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ, বিপুল পর্যটকের সমাগম ও যত্রতত্র প্লাস্টিক দূষণের কারণে দ্বীপটি ধ্বংসের মুখে পড়েছিলো। সেন্ট মার্টিনে একসময় প্রবাল, শৈবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শামুক, ঝিনুক, বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, কাঁকড়াসহ প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ছিলো। গত দুই দশকে তার অনেক কিছুই বিলুপ্ত হয়েছে। এ কারণেই সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করে।

সেন্ট মার্টিনে রাতের বেলা সৈকতে আলো জ্বালানোয় নিষেধাজ্ঞা, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি এবং শামুক-ঝিনুক ও প্রবাল আহরণ বন্ধসহ ১২টি নির্দেশনা বাস্তবায়নের ফলে দ্বীপটির প্রকৃতিতে ইতিবাচক অনেক পরিবর্তন এসেছে। দ্বীপের গাছগুলোয় ফল ধরেছে। নতুন চারা গজাচ্ছে। সৈকতে যান্ত্রিক মোটরযানের চলাচল বন্ধ হওয়ায় রাজ কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও শৈবালের বিস্তৃতি বেড়েছে। কেয়াবন ও পাথর স্তূপে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনা বেড়েছে, যা আগে পর্যটকদের চাপে প্রায় অদৃশ্য হয়ে পড়েছিলো। স্থানীয় মানুষ জানায়, পর্যটক সীমিতকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে দ্বীপের পরিবেশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

দ্বীপের পরিবেশ ফেরাতে যে সংস্থাগুলো কাজ করছে তাদের একটি ‘ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি’। এই সংস্থার নির্বাহী কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, পর্যটক কমায় সেন্ট মার্টিনে মা কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ ফিরে এসেছে। প্রথম বছরে ৩ হাজার এবং দ্বিতীয় বছরে ৭ হাজারের বেশি কাছিমের ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচারিতে বাচ্চা উৎপাদন করে সাগরে অবমুক্ত করা হয়েছে। আগে কাছিমের ডিম বেওয়ারিশ কুকুর খেয়ে ফেলত। এখন অভুক্ত তিন হাজার কুকুরকে দিনে একবেলা করে খাবার সরবরাহ করছে একটি বেসরকারি সংস্থা। ফলে কাছিমের ডিম সুরক্ষা পাচ্ছে।

‘সেন্ট মার্টিনের দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’ নামে ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের কাজ চলছে দ্বীপটিতে। এ প্রকল্পের পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, দ্বীপের ছেঁড়াদিয়া, গোলদিয়া ও দিয়ারমাথায় প্রবাল-শৈবাল বিস্তার ঘটছে। শৈবাল ও চুনাপাথরের গায়ে অজস্র শামুক-ঝিনুক আঁকড়ে আছে। বালিয়াড়িতে প্যারাবন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। প্যারাবনে ব্যাঙ, সাপ, টিকটিকি, প্রজাপতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণ বাড়ছে, যা তিন বছর আগে ছিলো না।