কুষ্টিয়া ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় এনজিওর নামে সাধারণ মানুষের শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত মো. আনিছুর রহমানকে পুলিশ পুনরায় গ্রেফতার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতারণার মামলায় পলাতক থাকার পর সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত বিশেষ অভিযানে তাকে পাকড়াও করা হয় এবং পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই কুষ্টিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক থানায় ছুটে আসেন।
তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত আনিছুর রহমান ২০০৬ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার আলাউদ্দিন নগর এলাকায় ‘বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও চালু করেন। এই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তিনি কুষ্টিয়া ছাড়াও রাজবাড়ী, পাবনা ও ঝিনাইদহসহ দেশের একাধিক জেলায় শত শত শাখা বিস্তার করেন। সাধারণ মানুষকে অল্প সময়ে দ্বিগুণ মুনাফা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তিনি ডিপিএস ও বিভিন্ন মেয়াদি স্কিমের নামে হাজার হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। এভাবে সংগৃহীত কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে তিনি কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি, জমি ও দামি গাড়ির মালিক বনে যান।
গ্রাহকদের সন্দেহ হলে এবং বিনিয়োগ করা টাকা ফেরতের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে, অভিযুক্ত আনিছুর রহমান ২০২৩ সালের শেষের দিকে তার প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে পালিয়ে যান। এরপর ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে প্রায় ১২৪টি প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের মামলা দায়ের করেন। এসব মামলার প্রেক্ষিতে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন এবং পরবর্তীতে ১২টি মামলায় তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়। এর আগে গত বছরের এপ্রিল মাসে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় তাকে বিমানবন্দর থেকে একবার গ্রেফতার করে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
তবে গত বছরের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও উত্তাল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা কারাগার ভেঙে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এই প্রতারক। কারাগار থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন এবং ফের বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। সম্প্রতি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান নিশ্চিত করে পুলিশ তাকে পুনরায় আটক করতে সক্ষম হয়। তার বিরুদ্ধে থাকা অসংখ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা ও সাজার পরোয়ানা কার্যকর করতে পুলিশ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
সারাজীবনের জমানো কষ্টের অর্থ হারিয়ে এবং প্রতারক প্রধানের গ্রেফতারের খবর পেয়ে বহু অসহায় মানুষ কুমারখালী থানায় ভিড় জমান। সারাজীবন পোশাক কারখানায় চাকরি করে জমানো সাড়ে এগারো লাখ টাকা দ্বিগুণ লাভের আশায় এই এনজিওতে জমা দিয়েছিলেন রাজবাড়ীর এক প্রবীণ ব্যক্তি, যিনি এখন সর্বস্বান্ত। একইভাবে নানা মানুষ আত্মীয়স্বজন বা নিজেদের শেষ সম্বল বিশ্বাস করে এই প্রতারকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এখন তাদের গচ্ছিত অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য অথবা এই অপরাধীর কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছেন।




































