দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন খাতের অগ্রগতির লক্ষে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি বড় পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মোট ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপন করা হতে চলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই প্যাকেজের আওতায় বেশ কিছু নতুন উদ্যোগের পাশাপাশি চলমান কয়েকটি প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বর্তমান অর্থবছরের চতুর্থ এই সভায় সরকারের নীতিনির্ধারকরা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে এসব প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসনের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় উপস্থাপিত হতে যাওয়া এসব প্রকল্পের সুফল দেশের সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের জনপদ ভোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ১৬টি প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৮৬৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকারও বেশি, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। এই বিশাল অঙ্কের ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকার বেশি জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ ও অনুদান হিসেবে আসবে প্রায় ৫ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করা হবে। নতুন অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ এবং শক্তিশালীকরণের কাজটি অন্যতম অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এই সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ জিওবি বা সরকারি তহবিল থেকে নির্বাহ করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের গ্রামীণ যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি আসবে।
জনস্বাস্থ্য খাতের সুরক্ষায় বেশ কিছু বড় উদ্যোগ একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করা হচ্ছে, যার মধ্যে যক্ষ্মা, এইচআইভি-এইডস এবং ম্যালেরিয়া মোকাবিলার একটি বিশাল প্রকল্প রয়েছে। প্রায় চার হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ স্বাস্থ্য প্রকল্পে এসব সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে দেশব্যাপী আধুনিক সেবা ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এছাড়া, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আরও একটি পৃথক স্বাস্থ্য প্রকল্প এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, তিন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার একটি নতুন বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বৈদেশিক ঋণ ও সংস্থার নিজস্ব তহবিলের পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নও ব্যবহার করা হবে। ফেনীর সোনাগাজীতে নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের আরও একটি ছোট প্রকল্পও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।
নতুন উদ্যোগের পাশাপাশি চলমান কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবও এই সভায় উঠছে, যার মধ্যে বিমানবন্দর ও নগর অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণের তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যদিও এর ফলে সরকারি অনুদান বা তহবিল কমানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। একইভাবে যশোর, সৈয়দপুর ও রাজশাহী বিমানবন্দরের রানওয়ে সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো সংক্রান্ত চলমান প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও মেয়াদ পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগ ও নাগরিক সেবার মান বাড়িয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই এসব সংশোধনী আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হলে দেশের অবকাঠামো ও সেবা খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।




































