ঢাকা ১২:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তাজমহল: ভালোবাসার নিদর্শনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মমতাজ মহলের বেদনার গল্প

বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল যুগ যুগ ধরে অমর প্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে সমাদৃত। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশে যমুনা নদীর তীরে যে শ্বেতপাথরের সৌধ নির্মাণ করেছিলেন, তার সৌন্দর্যে আজও মুগ্ধ পুরো বিশ্ব।

তবে এই মহাকাব্যিক রোমান্টিক আবহের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। তাজমহলের ইতিহাস কেবল ভালোবাসার নয়, এটি সপ্তদশ শতাব্দীর মাতৃমৃত্যু এবং একজন নারীর ওপর ক্রমাগত সন্তান জন্মদানের শারীরিক ও মানসিক ধকলের এক বিষাদময় উপাখ্যান।

বুরহানপুরের সেই অভিশপ্ত গ্রীষ্ম ও মমতাজের বিদায়

১৬৩১ সালের ১৭ জুন। দাক্ষিণাত্যের (দক্ষিণ ভারত) বুরহানপুরে তখন গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ। পঞ্চম মুঘল সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল সেই প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই তাঁর জীবনের ১৪তম প্রসববেদনায় কাতর। প্রসবের সময় তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন ১৭ বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ কন্যা জাহানারা ও রাজচিকিৎসকেরা।

ইতিহাসবিদ সুপ্রিয়া গান্ধী তাঁর ‘দ্য এম্পেরর হু নেভার ওয়াজ’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, সে সময়ের মুঘল হাকিমরা বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিলেন। তাঁদের মতে, মানবদেহ চারটি উপাদানের সমন্বয় এবং এর ভারসাম্যই সুস্থতার চাবিকাঠি। মমতাজ মহলের শরীরে সেই ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘ ৩০ ঘণ্টা প্রসবযন্ত্রণা সহ্য করার পর মমতাজ মহল গওহর আরা নামের এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু প্রসবের পরপরই তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে ‘পোস্টপার্টাম হেমোরেজ’ বলা হয়। যন্ত্রণায় কাতর সম্রাজ্ঞী সন্তানদের ও মাকে সম্রাটের তত্ত্বাবধানে রেখে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে এটি ছিল তাঁর ১৪তম প্রসব, যার মধ্যে সাতজন সন্তানই শৈশবে মারা গিয়েছিল।

পর্দার আড়ালের ক্ষমতাধর সম্রাজ্ঞী

১৬১২ সালে যুবরাজ খুররমের (পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান) সঙ্গে বিয়ের পর আরজুমান্দ বানু বেগম উপাধি পান ‘মমতাজ মহল’ বা প্রাসাদের সবচেয়ে প্রিয় নারী। ১৬২৮ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর শাহজাহান তাঁকে ‘পাদশাহ বেগম’, ‘মালিকা-এ-জাহান’সহ অসংখ্য রাজকীয় উপাধিতে ভূষিত করেন।

শাহজাহানের রাজনৈতিক প্রয়োজনে আরও দুটি বিয়ে থাকলেও, মমতাজই ছিলেন তাঁর প্রধান নির্ভরতা। অ্যালিসন ব্যাংকস ফাইন্ডলির ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মমতাজ মহল প্রাসাদের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ‘খাস মহলে’ থাকতেন এবং বার্ষিক ১০ লাখ রুপি ভাতা পেতেন। ফুফু নূরজাহানের মতো মমতাজও পর্দার আড়ালে থেকে প্রকাশ্য দরবারে সম্রাটের সঙ্গে উপস্থিত থাকতেন। সম্রাটের রাজমোহর থাকত মমতাজের কাছে এবং তাঁর অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতো না। বিশ্বস্ত সহকারী সতি-উল-নিসার মাধ্যমে তিনি নারীদের ও দরিদ্রদের আবেদন যাচাই করে সম্রাটের কাছে পৌঁছাতেন। তাঁর সুপারিশে বহু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্ষমা পেতেন। এরান্ডোলের সর্দার কানোজির পদ নিশ্চিত করে প্রজাদের কল্যাণে মমতাজের জারি করা একটি ফরমান আজও ইতিহাসে সংরক্ষিত আছে।

সম্রাটের শোক ও এক মহাকাব্যিক সৌধের জন্ম

মমতাজের মৃত্যু শাহজাহানকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয়। দরবারি ইতিহাসবিদ আবদুল হামিদ লাহৌরি লিখেছেন, সম্রাটের শোক এতই গভীর ছিল যে তাঁর মাথার চুল দ্রুত সাদা হয়ে যায় এবং তিনি রঙিন পোশাক ত্যাগ করে সাদা শোকবস্ত্র পরিধান করেন। এক সপ্তাহ তিনি ঘরের বাইরে দেখা দেননি এবং রাজকার্যও পরিচালনা করেননি।

প্রথমে তাপ্তি নদীর তীরে জয়নাবাদের বাগানে মমতাজকে সমাহিত করা হলেও ১৬৩১ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মরদেহ আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে আনা হয়। রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে জমি নিয়ে শাহজাহান শুরু করেন বিশাল এক সমাধির কাজ। ফরাসি রত্ন ব্যবসায়ী জ্যাঁ-বাতিস্ত তাভার্নিয়েরের মতে, ২০ হাজার শ্রমিক ও এক হাজার হাতির পরিশ্রমে ২২ বছর ধরে নির্মিত হয় তাজমহল। এই সৌধ নির্মাণে সে সময় ৫০ লাখ রুপি ব্যয় হওয়ায় মুঘল কোষাগার প্রায় শূন্য হয়ে যায়। সাম্রাজ্যের অন্যান্য বিষয়ে অবহেলার সুযোগে ১৬৫৮ সালে আওরঙ্গজেব ক্ষমতা দখল করে শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করেন, যেখানে ১৬৬৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

কালো তাজমহলের গল্প: ইতিহাস নাকি নিছকই গুজব?

লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, শাহজাহান নিজের জন্য কালো পাথরের আরেকটি তাজমহল বানাতে চেয়েছিলেন এবং একটি সেতুর মাধ্যমে দুটি তাজমহল যুক্ত থাকার কথা ছিল। ১৬৬৫ সালে ফরাসি পর্যটক তাভার্নিয়ে প্রথম এই দাবি করেন। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা এটিকে ভিত্তিহীন জনশ্রুতি মনে করেন। তাজমহলে শাহজাহানের কবর মমতাজের কবরের মতো ঠিক কেন্দ্রে নয়, বরং পাশে অবস্থিত। ইতিহাসবিদ আর. নাথ জানান, তাজমহল ১৬৪৮ সালেই সম্পূর্ণ হয়েছিল এবং এটি কেবল মমতাজের জন্যই নির্মিত হওয়ায় কেন্দ্রস্থলটি তাঁর জন্যই নির্ধারিত ছিল। পরবর্তীতে শাহজাহানকে কেবল স্ত্রীর পাশেই সমাহিত করা হয়।

প্রেমের প্রতীক নাকি মাতৃমৃত্যুর নীরব দলিল?

তাজমহলকে বিশ্ববাসী ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখলেও স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি মাতৃমৃত্যুর এক ভয়াবহ দলিল। ১৯ বছরের দাম্পত্যে প্রায় প্রতি বছর গর্ভবতী হওয়ার শারীরিক ধকল মমতাজ মহলকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

গবেষক অনন্ত কুমার তাঁর নিবন্ধে এই প্রেক্ষাপটকে ইউরোপের সাথে তুলনা করেছেন। সপ্তদশ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যে যখন মমতাজ প্রসবকালীন জটিলতায় মারা যাচ্ছেন, প্রায় একই সময়ে সুইডেনের রানি উলরিকা এলিওনোরা কমিউনিটি পর্যায়ে নারীদের ধাত্রী প্রশিক্ষণের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছিলেন। এই উদ্যোগের ফলে ১৯০০ সালের মধ্যেই সুইডেনে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২৩০-এ নেমে আসে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাজমহল নির্মাণে ব্যয় করা বিপুল মুঘল সম্পদের সামান্য অংশও যদি প্রসূতি ও শিশু পরিচর্যার জন্য একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় করা হতো, তবে তা শুধু ভালোবাসার প্রতীকই হতো না, বরং মমতাজ মহলের মতো অসংখ্য সাধারণ নারীর জীবন বাঁচাতে পারত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তাজমহল কেবল রাজকীয় প্রেমের অমর কীর্তি নয়, শতাব্দী ধরে প্রসবজনিত জটিলতায় অকালে ঝরে যাওয়া নারীদের জীবনেরও এক নীরব স্মারক।

ওয়াকার মুস্তাফা, সাংবাদিক ও গবেষক

জনপ্রিয়

নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি, আগস্টে আক্রান্ত ৭১০ জন

তাজমহল: ভালোবাসার নিদর্শনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মমতাজ মহলের বেদনার গল্প

প্রকাশিত ০৮:০০:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল যুগ যুগ ধরে অমর প্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে সমাদৃত। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশে যমুনা নদীর তীরে যে শ্বেতপাথরের সৌধ নির্মাণ করেছিলেন, তার সৌন্দর্যে আজও মুগ্ধ পুরো বিশ্ব।

তবে এই মহাকাব্যিক রোমান্টিক আবহের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। তাজমহলের ইতিহাস কেবল ভালোবাসার নয়, এটি সপ্তদশ শতাব্দীর মাতৃমৃত্যু এবং একজন নারীর ওপর ক্রমাগত সন্তান জন্মদানের শারীরিক ও মানসিক ধকলের এক বিষাদময় উপাখ্যান।

বুরহানপুরের সেই অভিশপ্ত গ্রীষ্ম ও মমতাজের বিদায়

১৬৩১ সালের ১৭ জুন। দাক্ষিণাত্যের (দক্ষিণ ভারত) বুরহানপুরে তখন গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ। পঞ্চম মুঘল সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল সেই প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই তাঁর জীবনের ১৪তম প্রসববেদনায় কাতর। প্রসবের সময় তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন ১৭ বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ কন্যা জাহানারা ও রাজচিকিৎসকেরা।

ইতিহাসবিদ সুপ্রিয়া গান্ধী তাঁর ‘দ্য এম্পেরর হু নেভার ওয়াজ’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, সে সময়ের মুঘল হাকিমরা বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিলেন। তাঁদের মতে, মানবদেহ চারটি উপাদানের সমন্বয় এবং এর ভারসাম্যই সুস্থতার চাবিকাঠি। মমতাজ মহলের শরীরে সেই ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘ ৩০ ঘণ্টা প্রসবযন্ত্রণা সহ্য করার পর মমতাজ মহল গওহর আরা নামের এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু প্রসবের পরপরই তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে ‘পোস্টপার্টাম হেমোরেজ’ বলা হয়। যন্ত্রণায় কাতর সম্রাজ্ঞী সন্তানদের ও মাকে সম্রাটের তত্ত্বাবধানে রেখে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে এটি ছিল তাঁর ১৪তম প্রসব, যার মধ্যে সাতজন সন্তানই শৈশবে মারা গিয়েছিল।

পর্দার আড়ালের ক্ষমতাধর সম্রাজ্ঞী

১৬১২ সালে যুবরাজ খুররমের (পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান) সঙ্গে বিয়ের পর আরজুমান্দ বানু বেগম উপাধি পান ‘মমতাজ মহল’ বা প্রাসাদের সবচেয়ে প্রিয় নারী। ১৬২৮ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর শাহজাহান তাঁকে ‘পাদশাহ বেগম’, ‘মালিকা-এ-জাহান’সহ অসংখ্য রাজকীয় উপাধিতে ভূষিত করেন।

শাহজাহানের রাজনৈতিক প্রয়োজনে আরও দুটি বিয়ে থাকলেও, মমতাজই ছিলেন তাঁর প্রধান নির্ভরতা। অ্যালিসন ব্যাংকস ফাইন্ডলির ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মমতাজ মহল প্রাসাদের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ‘খাস মহলে’ থাকতেন এবং বার্ষিক ১০ লাখ রুপি ভাতা পেতেন। ফুফু নূরজাহানের মতো মমতাজও পর্দার আড়ালে থেকে প্রকাশ্য দরবারে সম্রাটের সঙ্গে উপস্থিত থাকতেন। সম্রাটের রাজমোহর থাকত মমতাজের কাছে এবং তাঁর অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতো না। বিশ্বস্ত সহকারী সতি-উল-নিসার মাধ্যমে তিনি নারীদের ও দরিদ্রদের আবেদন যাচাই করে সম্রাটের কাছে পৌঁছাতেন। তাঁর সুপারিশে বহু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্ষমা পেতেন। এরান্ডোলের সর্দার কানোজির পদ নিশ্চিত করে প্রজাদের কল্যাণে মমতাজের জারি করা একটি ফরমান আজও ইতিহাসে সংরক্ষিত আছে।

সম্রাটের শোক ও এক মহাকাব্যিক সৌধের জন্ম

মমতাজের মৃত্যু শাহজাহানকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয়। দরবারি ইতিহাসবিদ আবদুল হামিদ লাহৌরি লিখেছেন, সম্রাটের শোক এতই গভীর ছিল যে তাঁর মাথার চুল দ্রুত সাদা হয়ে যায় এবং তিনি রঙিন পোশাক ত্যাগ করে সাদা শোকবস্ত্র পরিধান করেন। এক সপ্তাহ তিনি ঘরের বাইরে দেখা দেননি এবং রাজকার্যও পরিচালনা করেননি।

প্রথমে তাপ্তি নদীর তীরে জয়নাবাদের বাগানে মমতাজকে সমাহিত করা হলেও ১৬৩১ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মরদেহ আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে আনা হয়। রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে জমি নিয়ে শাহজাহান শুরু করেন বিশাল এক সমাধির কাজ। ফরাসি রত্ন ব্যবসায়ী জ্যাঁ-বাতিস্ত তাভার্নিয়েরের মতে, ২০ হাজার শ্রমিক ও এক হাজার হাতির পরিশ্রমে ২২ বছর ধরে নির্মিত হয় তাজমহল। এই সৌধ নির্মাণে সে সময় ৫০ লাখ রুপি ব্যয় হওয়ায় মুঘল কোষাগার প্রায় শূন্য হয়ে যায়। সাম্রাজ্যের অন্যান্য বিষয়ে অবহেলার সুযোগে ১৬৫৮ সালে আওরঙ্গজেব ক্ষমতা দখল করে শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করেন, যেখানে ১৬৬৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

কালো তাজমহলের গল্প: ইতিহাস নাকি নিছকই গুজব?

লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, শাহজাহান নিজের জন্য কালো পাথরের আরেকটি তাজমহল বানাতে চেয়েছিলেন এবং একটি সেতুর মাধ্যমে দুটি তাজমহল যুক্ত থাকার কথা ছিল। ১৬৬৫ সালে ফরাসি পর্যটক তাভার্নিয়ে প্রথম এই দাবি করেন। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা এটিকে ভিত্তিহীন জনশ্রুতি মনে করেন। তাজমহলে শাহজাহানের কবর মমতাজের কবরের মতো ঠিক কেন্দ্রে নয়, বরং পাশে অবস্থিত। ইতিহাসবিদ আর. নাথ জানান, তাজমহল ১৬৪৮ সালেই সম্পূর্ণ হয়েছিল এবং এটি কেবল মমতাজের জন্যই নির্মিত হওয়ায় কেন্দ্রস্থলটি তাঁর জন্যই নির্ধারিত ছিল। পরবর্তীতে শাহজাহানকে কেবল স্ত্রীর পাশেই সমাহিত করা হয়।

প্রেমের প্রতীক নাকি মাতৃমৃত্যুর নীরব দলিল?

তাজমহলকে বিশ্ববাসী ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখলেও স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি মাতৃমৃত্যুর এক ভয়াবহ দলিল। ১৯ বছরের দাম্পত্যে প্রায় প্রতি বছর গর্ভবতী হওয়ার শারীরিক ধকল মমতাজ মহলকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

গবেষক অনন্ত কুমার তাঁর নিবন্ধে এই প্রেক্ষাপটকে ইউরোপের সাথে তুলনা করেছেন। সপ্তদশ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যে যখন মমতাজ প্রসবকালীন জটিলতায় মারা যাচ্ছেন, প্রায় একই সময়ে সুইডেনের রানি উলরিকা এলিওনোরা কমিউনিটি পর্যায়ে নারীদের ধাত্রী প্রশিক্ষণের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছিলেন। এই উদ্যোগের ফলে ১৯০০ সালের মধ্যেই সুইডেনে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২৩০-এ নেমে আসে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাজমহল নির্মাণে ব্যয় করা বিপুল মুঘল সম্পদের সামান্য অংশও যদি প্রসূতি ও শিশু পরিচর্যার জন্য একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় করা হতো, তবে তা শুধু ভালোবাসার প্রতীকই হতো না, বরং মমতাজ মহলের মতো অসংখ্য সাধারণ নারীর জীবন বাঁচাতে পারত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তাজমহল কেবল রাজকীয় প্রেমের অমর কীর্তি নয়, শতাব্দী ধরে প্রসবজনিত জটিলতায় অকালে ঝরে যাওয়া নারীদের জীবনেরও এক নীরব স্মারক।

ওয়াকার মুস্তাফা, সাংবাদিক ও গবেষক