ঢাকা ০২:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ
Logo স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই প্রায় ৭ কোটি বাংলাদেশির Logo দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এমপি নজরুলের আসন শূন্য হওয়া নিয়ে যা জানালো ইসি Logo রান্না হতেই বদলে গেল রঙ, সবুজ মাংসের কড়াই নিয়ে সোজা থানায় ভুক্তভোগীরা! Logo জুলাই শহীদদের স্মরণে ছাত্রদলের দোয়া মাহফিল  Logo চরভদ্রাসনে খাল কাটায় ‘ভূতুড়ে শ্রমিক’: কাগজে ১৭৮, মাঠে ৫০ Logo কর্মসংস্থানে সমতার অঙ্গীকারে এসডিজি ব্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হলো স্বপ্ন Logo চার্জিং অ্যাংজাইটিকে বিদায় জানাচ্ছে ভিভোর নতুন ফোন Logo সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুলকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার Logo জাবি মেডিকেল সেন্টারের ওষুধ কারচুপির ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন Logo পাবিপ্রবিতে র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় ৩ সদস্যের কমিটি গঠন 

কুড়িগ্রামের দিনমজুর থেকে দোহারের সফল বর্গা চাষী মোহাম্মদ হোসেন

নিজের কোনো জমি নেই, নেই মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানাও। কিন্তু বুকে আছে হাড়ভাঙা খাটুনি আর সততার জোর। এই সততার ওপর ভর করেই সাফল্যের নতুন এক গল্প বুনেছেন মোহাম্মদ হোসেন। এই বছর ঢাকার দোহার উপজেলার জামালচর গ্রামে অন্যের তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন এই সংগ্রামী কৃষক।

মোহাম্মদ হোসেন জানান, তাঁর স্থায়ী বাড়ি দোহারে নয়। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায়। সেখানে নিজের জমিজমা না থাকায় এবং চরম অভাব-অনটনের কারণে বাধ্য হয়ে প্রায় চার বছর আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে দোহারে পাড়ি জমান। প্রথমে দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তীতে তিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে পুরোদমে চাষাবাদ শুরু করেন।

ধান কাটার এই ব্যস্ত মৌসুমে মাঠে কথা হয় হোসেন আলীর স্ত্রী বেগম খাতুনের সাথেও। তিনি তাঁর স্বামী ও অন্যান্য দিনমজুরদের জন্য বাড়ি থেকে সকালের নাস্তা নিয়ে এসেছেন মাঠে। একসময় গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে সকালের এই চিরচেনা দৃশ্যটি অতি সাধারণ এক ঐতিহ্য থাকলেও, যান্ত্রিকতার যুগে বর্তমানে তা খুব কমই চোখে পড়ে। জামালচরের মাঠে হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর এই মেলবন্ধন যেন সেই পুরোনো ঐতিহ্যকেই আবার মনে করিয়ে দিল।

চলতি মৌসুমে মোহাম্মদ হোসেন দোহার এলাকায় তিন বিঘা জমি বর্গা নেন। নিজের জমানো এবং ধারদেনা করা মাত্র ১৫,০০০ টাকাপুঁজি নিয়ে মাঠে নামেন তিনি। তবে তাঁর এই লড়াইয়ে বড় সহায় হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় কৃষি বিভাগ। উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত জাতের ব্রি-১০১ ধানের বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক সহায়তা পান।

কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ এবং হোসেনের দিনরাত কঠোর পরিশ্রমের পর এসেছে কাঙ্ক্ষিত ফলন। চলতি ধান কাটার মৌসুমে ওই তিন বিঘা জমি থেকে তিনি প্রায় ৮৫ মণ ধান ঘরে তুলেছেন। বর্তমান বাজারে ধানের দাম অনুযায়ী মাত্র ১৫,০০০ টাকা নিজস্ব খরচে এই পরিমাণ ফলন পাওয়া যে কোনো কৃষকের জন্যই এক বিশাল বড় প্রাপ্তি। অনন্য এই সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্প্রতি দোহার উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশেষভাবে পুরস্কৃতও করা হয়।

ঈদুল আজহার ঠিক আগ মুহূর্তে ঘরে এত বিপুল পরিমাণ ধান আসায় মোহাম্মদ হোসেনের পরিবারে বইছে আনন্দের বন্যা। যেখানে দু-মুঠো ভাতের জোগান করতেই একসময় হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এই ধানের আয় দিয়ে এখন ঈদের আনন্দ মেটানো এবং সারা বছরের খোরাকি জোগান দেওয়া সম্ভব হবে।

হাসিমুখে কৃষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, “নিজের ভিটেমাটি ছাইড়া যখন পরিবার নিয়া দোহারে আইছিলাম, তখন হাত খালি ছিল। মানুষের জমিতে রোদে পুইড়া, বৃষ্টিতে ভিজা রক্ত পানি করছি। আল্লাহ আমার দিকে মুখ তুইলা তাকাইছেন। কৃষি অফিসের স্যারেরা আমারে বীজ, সার দিয়া আর বুদ্ধি দিয়া অনেক উপকার করছে। ১৫,০০০ টাকা খরচ কইরা ৮৫ মণ ধান পামু, এইডা ভাবতেও পারি নাই। এইবার পরিবার নিয়া অন্তত শান্তিতে ঈদ করবার পারমু।”

দোহারের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মোহাম্মদ হোসেনের মতো হাজারো প্রান্তিক ও বর্গা চাষি আমাদের দেশের কৃষি খাতকে সচল রাখছেন। নিজের জমি না থাকলেও সরকারি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, উপযুক্ত পরিচর্যা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যে কৃষিতে এমন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব— কৃষক হোসেন আজ তার এক অনন্য উজ্জ্বল উদাহরণ।

জনপ্রিয়

স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই প্রায় ৭ কোটি বাংলাদেশির

কুড়িগ্রামের দিনমজুর থেকে দোহারের সফল বর্গা চাষী মোহাম্মদ হোসেন

প্রকাশিত ০৪:০৫:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

নিজের কোনো জমি নেই, নেই মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানাও। কিন্তু বুকে আছে হাড়ভাঙা খাটুনি আর সততার জোর। এই সততার ওপর ভর করেই সাফল্যের নতুন এক গল্প বুনেছেন মোহাম্মদ হোসেন। এই বছর ঢাকার দোহার উপজেলার জামালচর গ্রামে অন্যের তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন এই সংগ্রামী কৃষক।

মোহাম্মদ হোসেন জানান, তাঁর স্থায়ী বাড়ি দোহারে নয়। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায়। সেখানে নিজের জমিজমা না থাকায় এবং চরম অভাব-অনটনের কারণে বাধ্য হয়ে প্রায় চার বছর আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে দোহারে পাড়ি জমান। প্রথমে দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তীতে তিনি অন্যের জমি বর্গা নিয়ে পুরোদমে চাষাবাদ শুরু করেন।

ধান কাটার এই ব্যস্ত মৌসুমে মাঠে কথা হয় হোসেন আলীর স্ত্রী বেগম খাতুনের সাথেও। তিনি তাঁর স্বামী ও অন্যান্য দিনমজুরদের জন্য বাড়ি থেকে সকালের নাস্তা নিয়ে এসেছেন মাঠে। একসময় গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে সকালের এই চিরচেনা দৃশ্যটি অতি সাধারণ এক ঐতিহ্য থাকলেও, যান্ত্রিকতার যুগে বর্তমানে তা খুব কমই চোখে পড়ে। জামালচরের মাঠে হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর এই মেলবন্ধন যেন সেই পুরোনো ঐতিহ্যকেই আবার মনে করিয়ে দিল।

চলতি মৌসুমে মোহাম্মদ হোসেন দোহার এলাকায় তিন বিঘা জমি বর্গা নেন। নিজের জমানো এবং ধারদেনা করা মাত্র ১৫,০০০ টাকাপুঁজি নিয়ে মাঠে নামেন তিনি। তবে তাঁর এই লড়াইয়ে বড় সহায় হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় কৃষি বিভাগ। উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত জাতের ব্রি-১০১ ধানের বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক সহায়তা পান।

কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ এবং হোসেনের দিনরাত কঠোর পরিশ্রমের পর এসেছে কাঙ্ক্ষিত ফলন। চলতি ধান কাটার মৌসুমে ওই তিন বিঘা জমি থেকে তিনি প্রায় ৮৫ মণ ধান ঘরে তুলেছেন। বর্তমান বাজারে ধানের দাম অনুযায়ী মাত্র ১৫,০০০ টাকা নিজস্ব খরচে এই পরিমাণ ফলন পাওয়া যে কোনো কৃষকের জন্যই এক বিশাল বড় প্রাপ্তি। অনন্য এই সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্প্রতি দোহার উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশেষভাবে পুরস্কৃতও করা হয়।

ঈদুল আজহার ঠিক আগ মুহূর্তে ঘরে এত বিপুল পরিমাণ ধান আসায় মোহাম্মদ হোসেনের পরিবারে বইছে আনন্দের বন্যা। যেখানে দু-মুঠো ভাতের জোগান করতেই একসময় হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এই ধানের আয় দিয়ে এখন ঈদের আনন্দ মেটানো এবং সারা বছরের খোরাকি জোগান দেওয়া সম্ভব হবে।

হাসিমুখে কৃষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, “নিজের ভিটেমাটি ছাইড়া যখন পরিবার নিয়া দোহারে আইছিলাম, তখন হাত খালি ছিল। মানুষের জমিতে রোদে পুইড়া, বৃষ্টিতে ভিজা রক্ত পানি করছি। আল্লাহ আমার দিকে মুখ তুইলা তাকাইছেন। কৃষি অফিসের স্যারেরা আমারে বীজ, সার দিয়া আর বুদ্ধি দিয়া অনেক উপকার করছে। ১৫,০০০ টাকা খরচ কইরা ৮৫ মণ ধান পামু, এইডা ভাবতেও পারি নাই। এইবার পরিবার নিয়া অন্তত শান্তিতে ঈদ করবার পারমু।”

দোহারের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মোহাম্মদ হোসেনের মতো হাজারো প্রান্তিক ও বর্গা চাষি আমাদের দেশের কৃষি খাতকে সচল রাখছেন। নিজের জমি না থাকলেও সরকারি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, উপযুক্ত পরিচর্যা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যে কৃষিতে এমন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব— কৃষক হোসেন আজ তার এক অনন্য উজ্জ্বল উদাহরণ।