ঢাকা ০৯:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

হামাগুড়ি দিয়ে এইচএসসি পাস, মনার পাশে জুড়ীর ইউএনও

হামাগুড়ি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলেজে যাতায়াত করে এইচএসসি পাস করা জুড়ীর মনা বেগমের পাশে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফজলে রাব্বানী চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ইউএনও মো. ফজলে রাব্বানী চৌধুরী মনার হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন। এ সময় তিনি মনার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে তার যেকোনো প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

মনা বেগম (২০) মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা-বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর বাগানের দিনমজুর হারিছ মিয়া ও আমিনা বেগমের মেয়ে। জন্মের পর থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠছেন তিনি। বাঁ হাত, বাঁ পা ও কোমরে শক্তি না থাকায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন না। ডান হাত ও ডান পায়ের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়েই চলাফেরা করতে হয় তাকে।

শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তার পড়াশোনার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। পাশের ফুলতলা ইউনিয়নের শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ২ দশমিক ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন মনা।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে প্রতিদিনই কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। বাড়ি থেকে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠতেন। কলেজ শেষে ফেরার সময়ও একইভাবে বাড়ি ফিরতে হতো।

মনা জানান, দীর্ঘ পথ হামাগুড়ি দেওয়ার কারণে অনেক সময় শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ত যে শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। তবুও পড়াশোনা বন্ধ করেননি তিনি।

মনা বলেন, “জন্ম থেকেই আমি প্রতিবন্ধী। পায়ে হাঁটতে পারি না। হাতের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করি। এভাবেই কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। এখন ডিগ্রিতে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু বই কেনার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই।”

মনার স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করা। তিনি বলেন, “আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলে আমি নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করব।”

বর্তমানে ডিগ্রি (পাস) শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মনা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট তার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাবা ও ছোট ভাই দিনমজুরি করে সংসার চালান। জরাজীর্ণ ঘরে মা-বাবা ও ভাই-বোনদের নিয়ে বসবাস তাদের।

সহজে চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশারও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে মনার। তার মতে, একটি অটোরিকশা থাকলে কলেজে যাতায়াতের কষ্ট অনেকটাই কমে যেত।

মনার মা আমিনা বেগম বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটারে ছোট থেকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছি, লেখাপড়া করিয়েছি। এখন অর্থের অভাবে আর পড়াতে পারছি না। মেয়েটার যদি একটা অটোরিকশা থাকত, তাহলে সে নিজে চলাফেরা করতে পারত।”

স্থানীয় বাসিন্দারাও মনার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রশংসা করেছেন। তারা বলেন, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হামাগুড়ি দিয়ে কলেজে যাতায়াত করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তার চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশা হলে পড়াশোনাসহ দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হবে।

জুড়ীর সামসুদ্দিন আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন চাষা মনার শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “মনা আমার বিদ্যালয়ে পড়ার সময় খুব ভালো ছাত্রী ছিল। লেখাপড়ার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সে অনেক কষ্ট করে হামাগুড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করত।”

মনার পাশে উপজেলা প্রশাসন দাঁড়ানোয় তার পরিবার ও স্থানীয়রা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এখন মনার স্বপ্ন—সব বাধা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা

জনপ্রিয়

নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল বঙ্গভবনে উঠবেন রোববার

হামাগুড়ি দিয়ে এইচএসসি পাস, মনার পাশে জুড়ীর ইউএনও

প্রকাশিত ০৬:৩০:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

হামাগুড়ি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলেজে যাতায়াত করে এইচএসসি পাস করা জুড়ীর মনা বেগমের পাশে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফজলে রাব্বানী চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ইউএনও মো. ফজলে রাব্বানী চৌধুরী মনার হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন। এ সময় তিনি মনার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে তার যেকোনো প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

মনা বেগম (২০) মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা-বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর বাগানের দিনমজুর হারিছ মিয়া ও আমিনা বেগমের মেয়ে। জন্মের পর থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠছেন তিনি। বাঁ হাত, বাঁ পা ও কোমরে শক্তি না থাকায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন না। ডান হাত ও ডান পায়ের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়েই চলাফেরা করতে হয় তাকে।

শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তার পড়াশোনার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। পাশের ফুলতলা ইউনিয়নের শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ২ দশমিক ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন মনা।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে প্রতিদিনই কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। বাড়ি থেকে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠতেন। কলেজ শেষে ফেরার সময়ও একইভাবে বাড়ি ফিরতে হতো।

মনা জানান, দীর্ঘ পথ হামাগুড়ি দেওয়ার কারণে অনেক সময় শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ত যে শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। তবুও পড়াশোনা বন্ধ করেননি তিনি।

মনা বলেন, “জন্ম থেকেই আমি প্রতিবন্ধী। পায়ে হাঁটতে পারি না। হাতের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করি। এভাবেই কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। এখন ডিগ্রিতে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু বই কেনার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই।”

মনার স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করা। তিনি বলেন, “আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলে আমি নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করব।”

বর্তমানে ডিগ্রি (পাস) শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মনা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট তার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাবা ও ছোট ভাই দিনমজুরি করে সংসার চালান। জরাজীর্ণ ঘরে মা-বাবা ও ভাই-বোনদের নিয়ে বসবাস তাদের।

সহজে চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশারও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে মনার। তার মতে, একটি অটোরিকশা থাকলে কলেজে যাতায়াতের কষ্ট অনেকটাই কমে যেত।

মনার মা আমিনা বেগম বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটারে ছোট থেকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছি, লেখাপড়া করিয়েছি। এখন অর্থের অভাবে আর পড়াতে পারছি না। মেয়েটার যদি একটা অটোরিকশা থাকত, তাহলে সে নিজে চলাফেরা করতে পারত।”

স্থানীয় বাসিন্দারাও মনার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রশংসা করেছেন। তারা বলেন, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হামাগুড়ি দিয়ে কলেজে যাতায়াত করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তার চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশা হলে পড়াশোনাসহ দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হবে।

জুড়ীর সামসুদ্দিন আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন চাষা মনার শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “মনা আমার বিদ্যালয়ে পড়ার সময় খুব ভালো ছাত্রী ছিল। লেখাপড়ার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সে অনেক কষ্ট করে হামাগুড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করত।”

মনার পাশে উপজেলা প্রশাসন দাঁড়ানোয় তার পরিবার ও স্থানীয়রা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এখন মনার স্বপ্ন—সব বাধা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা