জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) “ইনর্মাল খাতে কর্মসংস্থান তৈরির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইনফরমাল কর্মসংস্থানের ভূমিকা” শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজন করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাবি সংসদ।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ১২৯ নম্বর কক্ষে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
উদ্বোধনীতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাবি সংসদের শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ইমরান হাসান শুভ ব্যাটারি রিকশা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিদ্যুৎ ব্যবহারকে অপচয় হিসেবে দেখার সরকারি ধারণার সমালোচনা করে বলেন, ‘দেশের প্রায় ৮ কোটি কর্মসংস্থানের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত। বিশেষ করে ব্যাটারি রিকশা খাতে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল, যা বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি বড় ধরনের অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করছে। তাই এই খাতকে অবৈধ বা বোঝা হিসেবে না দেখে সঠিক নীতিমালার আওতায় আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকারের দুর্বল ব্যবস্থাপনার দায় শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে তাদের উচ্ছেদ না করে কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’
আলোচনায় অংশ নেয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা বলেন, ‘মেগা প্রকল্প ও শিল্পায়নের মূল লক্ষ্য শুধু মুনাফা নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া উচিত। ভারতের নেহরু আমলের উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়, রেলওয়ে অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে রেলবগি, ইঞ্জিন, স্টিলসহ বিভিন্ন শিল্প গড়ে তোলা হয়েছিল, যা ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করে। বিপরীতে বাংলাদেশে পাটকল, চিনিকল, কাগজ ও সার কারখানাগুলোকে কার্যকরভাবে সম্প্রসারণ না করে ধীরে ধীরে বেসরকারিকরণ করা হয়। কিন্তু বেসরকারিকরণের ফলে প্রত্যাশিত শিল্প ও কর্মসংস্থান না বেড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এবং কর্মসংস্থান কমেছে।’
‘বলা হয়, কোনো পাবলিক মিলের ভর্তুকিকে শুধু লোকসান হিসেবে দেখলে এর সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর অর্থনীতিকে উপেক্ষা করা হয়। একটি কারখানাকে ঘিরে শ্রমিকদের পাশাপাশি দোকান, হোটেল, পরিবহনসহ নানা ধরনের স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে ওঠে। মিল বন্ধ হলে পুরো এলাকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে গার্মেন্টস খাতকে বিভিন্ন সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়া হলেও কৃষিখাত থেকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা কমানো হয়েছে। এর ফলে কৃষি থেকে শ্রমিককে শিল্পখাতে স্থানান্তরের যে নীতি নেওয়া হয়েছে, তা কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য কতটা কার্যকর সে প্রশ্নও উঠে আসে তাঁর আলোচনায়।
এবিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোটের সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লসের নামে সাধারণ মানুষ ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে দায়ী করা হলেও বাস্তবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই বড় সমস্যা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন লস কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ চুরি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে গরিব রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে, যেখানে বড় গ্রাহকদের বকেয়া ও অপচয় নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ দেখা যায় না। তিনি বলেন, ব্যাটারি রিকশাসহ অনানুষ্ঠানিক খাতকে উচ্ছেদ না করে সঠিক নীতিমালার আওতায় আনতে হবে।’
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশের আমদানি ব্যয় কমবে এবং সাধারণ মানুষ নিজের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে। কিন্তু উচ্চ কর, নীতিগত জটিলতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক মানসিকতার কারণে এই খাত এগোতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন মেহেদী।
তার মতে, ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও নগর ব্যবস্থাপনার সংকট মোকাবিলায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে মানুষের শহরমুখী চাপ কমে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
এসময় ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি অদ্রি অংকুর, সেক্রেটারি ফাইজান অর্ক, সাংগঠনিক সম্পাদক মাইশা মনি, প্রচার সম্পাদক আনিকা তাবাসসুম ফারাবীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন।






























