ঢাকা ০২:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ
Logo মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও সম্পত্তি হস্তান্তরে তিন বিল সংসদে পাস Logo কাফরুলে শিশু অপহরণের অভিযোগে গ্রেফতার নারী কারাগারে Logo বিসিএসের ভাইভা দিতে ঢাকায় আসার পথে দুর্ঘটনায় ঢাবি শিক্ষার্থী নিহত Logo নীল নদের কুমিরই কি আটকে দেবে ট্রাম্পের সব নির্মাণ প্রকল্প? Logo শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিকতার অভিযোগ, সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট Logo স্বল্প পুঁজিতে লড়াই করেও হার বাংলাদেশের Logo সালমান শাহর সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল, জানালেন শাবনূর Logo পাড়ার মানুষের ব্যক্তিগত খবর বিক্রি করে দুই বাড়ির মালিক নারী Logo ইন্দোনেশিয়ায় বিমানবন্দরে আটকা ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী Logo মাননীয় স্পিকার, আমার একটা মাত্র বউ: সংসদে আইনমন্ত্রী

নীল নদের কুমিরই কি আটকে দেবে ট্রাম্পের সব নির্মাণ প্রকল্প?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে বিশাল বলরুম নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে শুরু হওয়া আইনি লড়াই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সুবাদে নতুন মোড় নিয়েছে। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্টের অন্যান্য নির্মাণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে চলমান আইনি চ্যালেঞ্জগুলোতে এই রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ১৯৭০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পরিত্যক্ত স্কি রিসোর্ট এবং মিশরের নীল নদের কুমিরকে কেন্দ্র করে করা পুরোনো মামলার প্রসঙ্গ টেনে ‘নান্দনিক স্বার্থে’ আদালতে যাওয়ার অধিকার নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। আইনি পরিভাষায় ‘অ্যাসথেটিক স্ট্যান্ডিং’ বা নান্দনিক স্বার্থ বলতে বোঝায়, কোনো প্রকল্পের কারণে কোনো ব্যক্তি যদি দৃশ্য, স্থাপনা বা বিপন্ন প্রাণী দেখার সুযোগ হারান, তবে তিনি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে মামলাকারীকে অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে তার প্রত্যক্ষ ও বাস্তব কোনো ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ষাটের দশকের মাঝামাঝি ক্যালিফোর্নিয়ার সিকোইয়া ন্যাশনাল পার্কসংলগ্ন একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকায় দ্য ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি একটি বিশাল স্কি রিসোর্ট বানানোর পরিকল্পনা করেছিল। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সিয়েরা ক্লাব’ এই বাণিজ্যিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে ১৯৭২ সালে মামলাটি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়। আদালত সে সময় রায় দিয়েছিলেন যে, পরিবেশের ক্ষতি হলেও সিয়েরা ক্লাব বা তাদের কোনো সদস্য ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা তারা প্রমাণ করতে পারেননি, ফলে তাদের মামলা করার আইনি অধিকার নেই। আইনি লড়াইয়ে হেরে গেলেও ওই সংগঠনের তীব্র আন্দোলনের মুখে ডিজনি কোম্পানি প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং পরবর্তী সময়ে ওই এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যানের অংশ হিসেবে চিরতরে সুরক্ষিত করা হয়। অন্যদিকে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নীল নদের অববাহিকায় উন্নয়ন প্রকল্পের ফলে কুমিরের আবাস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিলেন যে শুধু ক্ষতির আশঙ্কা তুললেই মামলা করার অধিকার তৈরি হয় না, এর জন্য বাস্তব ক্ষতি প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওয়াশিংটনে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করলে ঐতিহাসিক ও পরিবেশ সংরক্ষণবাদীরা নান্দনিক ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগ এনে আদালতের দ্বারস্থ হন। সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের এসব নির্মাণকাজের পক্ষে রায় দেওয়ার সময় সেই পুরোনো ‘নীল নদের কুমির’ মামলার আইনি যুক্তিটি সামনে নিয়ে আসেন। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ও উদারপন্থি বিচারপতিদের আপত্তি সত্ত্বেও পাঁচ রক্ষণশীল বিচারপতির রায়ের ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণকারী একটি সংগঠন বলরুম নির্মাণের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করার সুযোগ হারায়। এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ওয়াশিংটনের অন্যান্য নির্মাণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো বন্ধ করতে এই আইনি নজির জোরালোভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের আইনজীবীদের মতে, সমালোচকরা কোনো ‘বাস্তব ও নির্দিষ্ট ক্ষতি’ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং কেবল কোনো বিষয়ে বিরক্তি বা অপছন্দকে আইনি ক্ষতির সমতুল্য করা যায় না।

এদিকে পটোম্যাক নদীর তীরে তোরণ নির্মাণ কিংবা সরকারি গলফ কোর্স ও লিংকন মেমোরিয়ালের সংস্কার কাজের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলোতেও এই রায়কে হাতিয়ার করা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি রবার্টস তার ভিন্নমত প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন যে, সুদূর মিশরে কুমির দেখতে চাওয়ার অধিকার যদি আইনি ভিত্তি পেতে পারে, তবে নাগরিকদের হোয়াইট হাউজ বা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে চাওয়ার বিষয়টি কেন বিবেচনায় আসবে না। তবে সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আদালতের এই নতুন রায় চ্যালেঞ্জের পথকে বেশ কঠিন করে তুললেও তা পুরোপুরি অসম্ভব করে দেয়নি। মামলাকারীদের এখন আরও বেশি সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে যে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো ঠিক কী উপায়ে তাদের ব্যক্তিগত ও প্রত্যক্ষ ক্ষতি করছে। আইনি গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের রায় পরিবেশ আইন ও নান্দনিক ক্ষতির ধারণাকে আরও সীমিত করে ফেলতে পারে, যা সরকারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে।

জনপ্রিয়

মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও সম্পত্তি হস্তান্তরে তিন বিল সংসদে পাস

নীল নদের কুমিরই কি আটকে দেবে ট্রাম্পের সব নির্মাণ প্রকল্প?

প্রকাশিত ০১:৩৩:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে বিশাল বলরুম নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে শুরু হওয়া আইনি লড়াই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সুবাদে নতুন মোড় নিয়েছে। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্টের অন্যান্য নির্মাণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে চলমান আইনি চ্যালেঞ্জগুলোতে এই রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ১৯৭০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পরিত্যক্ত স্কি রিসোর্ট এবং মিশরের নীল নদের কুমিরকে কেন্দ্র করে করা পুরোনো মামলার প্রসঙ্গ টেনে ‘নান্দনিক স্বার্থে’ আদালতে যাওয়ার অধিকার নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। আইনি পরিভাষায় ‘অ্যাসথেটিক স্ট্যান্ডিং’ বা নান্দনিক স্বার্থ বলতে বোঝায়, কোনো প্রকল্পের কারণে কোনো ব্যক্তি যদি দৃশ্য, স্থাপনা বা বিপন্ন প্রাণী দেখার সুযোগ হারান, তবে তিনি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে মামলাকারীকে অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে তার প্রত্যক্ষ ও বাস্তব কোনো ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ষাটের দশকের মাঝামাঝি ক্যালিফোর্নিয়ার সিকোইয়া ন্যাশনাল পার্কসংলগ্ন একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকায় দ্য ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি একটি বিশাল স্কি রিসোর্ট বানানোর পরিকল্পনা করেছিল। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সিয়েরা ক্লাব’ এই বাণিজ্যিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে ১৯৭২ সালে মামলাটি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়। আদালত সে সময় রায় দিয়েছিলেন যে, পরিবেশের ক্ষতি হলেও সিয়েরা ক্লাব বা তাদের কোনো সদস্য ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা তারা প্রমাণ করতে পারেননি, ফলে তাদের মামলা করার আইনি অধিকার নেই। আইনি লড়াইয়ে হেরে গেলেও ওই সংগঠনের তীব্র আন্দোলনের মুখে ডিজনি কোম্পানি প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং পরবর্তী সময়ে ওই এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যানের অংশ হিসেবে চিরতরে সুরক্ষিত করা হয়। অন্যদিকে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নীল নদের অববাহিকায় উন্নয়ন প্রকল্পের ফলে কুমিরের আবাস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিলেন যে শুধু ক্ষতির আশঙ্কা তুললেই মামলা করার অধিকার তৈরি হয় না, এর জন্য বাস্তব ক্ষতি প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওয়াশিংটনে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করলে ঐতিহাসিক ও পরিবেশ সংরক্ষণবাদীরা নান্দনিক ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগ এনে আদালতের দ্বারস্থ হন। সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের এসব নির্মাণকাজের পক্ষে রায় দেওয়ার সময় সেই পুরোনো ‘নীল নদের কুমির’ মামলার আইনি যুক্তিটি সামনে নিয়ে আসেন। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ও উদারপন্থি বিচারপতিদের আপত্তি সত্ত্বেও পাঁচ রক্ষণশীল বিচারপতির রায়ের ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণকারী একটি সংগঠন বলরুম নির্মাণের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করার সুযোগ হারায়। এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ওয়াশিংটনের অন্যান্য নির্মাণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো বন্ধ করতে এই আইনি নজির জোরালোভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের আইনজীবীদের মতে, সমালোচকরা কোনো ‘বাস্তব ও নির্দিষ্ট ক্ষতি’ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং কেবল কোনো বিষয়ে বিরক্তি বা অপছন্দকে আইনি ক্ষতির সমতুল্য করা যায় না।

এদিকে পটোম্যাক নদীর তীরে তোরণ নির্মাণ কিংবা সরকারি গলফ কোর্স ও লিংকন মেমোরিয়ালের সংস্কার কাজের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলোতেও এই রায়কে হাতিয়ার করা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি রবার্টস তার ভিন্নমত প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন যে, সুদূর মিশরে কুমির দেখতে চাওয়ার অধিকার যদি আইনি ভিত্তি পেতে পারে, তবে নাগরিকদের হোয়াইট হাউজ বা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে চাওয়ার বিষয়টি কেন বিবেচনায় আসবে না। তবে সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আদালতের এই নতুন রায় চ্যালেঞ্জের পথকে বেশ কঠিন করে তুললেও তা পুরোপুরি অসম্ভব করে দেয়নি। মামলাকারীদের এখন আরও বেশি সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে যে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো ঠিক কী উপায়ে তাদের ব্যক্তিগত ও প্রত্যক্ষ ক্ষতি করছে। আইনি গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের রায় পরিবেশ আইন ও নান্দনিক ক্ষতির ধারণাকে আরও সীমিত করে ফেলতে পারে, যা সরকারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে।