ঢাকা ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ
Logo যাত্রাবাড়ীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবক নিহত Logo বিরামপুরে বিজিবি-গ্রামবাসীর বাধায় বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টা পণ্ড Logo মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও সম্পত্তি হস্তান্তরে তিন বিল সংসদে পাস Logo কাফরুলে শিশু অপহরণের অভিযোগে গ্রেফতার নারী কারাগারে Logo বিসিএসের ভাইভা দিতে ঢাকায় আসার পথে দুর্ঘটনায় ঢাবি শিক্ষার্থী নিহত Logo নীল নদের কুমিরই কি আটকে দেবে ট্রাম্পের সব নির্মাণ প্রকল্প? Logo শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিকতার অভিযোগ, সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট Logo স্বল্প পুঁজিতে লড়াই করেও হার বাংলাদেশের Logo সালমান শাহর সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল, জানালেন শাবনূর Logo পাড়ার মানুষের ব্যক্তিগত খবর বিক্রি করে দুই বাড়ির মালিক নারী

মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও সম্পত্তি হস্তান্তরে তিন বিল সংসদে পাস

মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গুমের মতো অপরাধকে কঠোর দণ্ডনীয় করা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগদখলের আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিল পাস হয়েছে। সম্প্রতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের পরিচালনায় কণ্ঠভোটে বিলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পাস করা হয়। তবে এই আইনগুলোর কয়েকটি ধারার তীব্র বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন এবং এই দিনটিকে সংসদীয় রাজনীতির জন্য একটি কালো অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন। মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তড়িঘড়ি করে এই জনগুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো পাস করা হলো। এর আগে গত আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে বিলগুলো প্রথম সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ ও সংশোধনী বিবেচনা করেই শেষ পর্যন্ত বিলগুলো পাসের জন্য উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ এর মাধ্যমে পুরনো ২০০৯ সালের আইন বাতিল করে একটি অধিকতর কার্যকর ও স্বাধীন কমিশন গঠনের পথ সুগম করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই নতুন কমিশন একজন চেয়ারম্যানসহ মোট চারজন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে, যেখানে নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে এবং ভিকটিমকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারির বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বহুল আলোচিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এ গুমকে একটি আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য এবং অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই আইনে গুমের অপরাধে জড়িতদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ভিকটিমের মৃত্যু বা দীর্ঘ নিখোঁজের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

এছাড়া সংশোধিত ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল, ২০২৬)’ এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের পুরনো আইনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন এই সংশোধনীর ফলে সম্পত্তি প্রদানকারী ব্যক্তি নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনি অধিকার পূর্ণমাত্রায় বজায় রাখতে পারবেন। সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এই আইনটি বাবা-মা বা অন্যান্য স্বজনদের দান করা সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এই বিলটি পাস হওয়ার সময় বিরোধীদলীয় পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয় এবং এটি ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী দাবি করে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যাওয়ার পরই বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা ওয়াকআউট করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আইনের কিছু নির্দিষ্ট ধারায় সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য বৈষম্যমূলক ও দ্বিমুখী নীতি রাখা হয়েছে, যা স্বাধীন বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

নতুন মানবাধিকার ও গুম সংক্রান্ত এই আইনগুলোতে বেশ কিছু নতুন বিচারিক প্রক্রিয়া ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে আদালতের তল্লাশি পরোয়ানা জারির ক্ষমতা, অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের মতো আধুনিক পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তির সম্পত্তি তার স্ত্রী ও নির্ভরশীলরা জীবনযাত্রার খরচ নির্বাহের জন্য ব্যবহার করতে পারবেন এবং দীর্ঘ পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি ‘গুমের সনদ’ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তদন্ত ও বিচারকার্য নির্ধারিত ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে এই আইনগুলোকে মানবাধিকার রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, বিরোধী দলগুলোর অব্যাহত সমালোচনা এবং ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে বিল পাসের এই ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে বেশ বড় ধরনের আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

জনপ্রিয়

যাত্রাবাড়ীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবক নিহত

মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও সম্পত্তি হস্তান্তরে তিন বিল সংসদে পাস

প্রকাশিত ০২:১৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গুমের মতো অপরাধকে কঠোর দণ্ডনীয় করা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগদখলের আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিল পাস হয়েছে। সম্প্রতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের পরিচালনায় কণ্ঠভোটে বিলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পাস করা হয়। তবে এই আইনগুলোর কয়েকটি ধারার তীব্র বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন এবং এই দিনটিকে সংসদীয় রাজনীতির জন্য একটি কালো অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন। মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তড়িঘড়ি করে এই জনগুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো পাস করা হলো। এর আগে গত আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে বিলগুলো প্রথম সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ ও সংশোধনী বিবেচনা করেই শেষ পর্যন্ত বিলগুলো পাসের জন্য উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ এর মাধ্যমে পুরনো ২০০৯ সালের আইন বাতিল করে একটি অধিকতর কার্যকর ও স্বাধীন কমিশন গঠনের পথ সুগম করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই নতুন কমিশন একজন চেয়ারম্যানসহ মোট চারজন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে, যেখানে নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে এবং ভিকটিমকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারির বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বহুল আলোচিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এ গুমকে একটি আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য এবং অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই আইনে গুমের অপরাধে জড়িতদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ভিকটিমের মৃত্যু বা দীর্ঘ নিখোঁজের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

এছাড়া সংশোধিত ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল, ২০২৬)’ এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের পুরনো আইনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন এই সংশোধনীর ফলে সম্পত্তি প্রদানকারী ব্যক্তি নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনি অধিকার পূর্ণমাত্রায় বজায় রাখতে পারবেন। সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এই আইনটি বাবা-মা বা অন্যান্য স্বজনদের দান করা সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এই বিলটি পাস হওয়ার সময় বিরোধীদলীয় পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয় এবং এটি ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী দাবি করে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যাওয়ার পরই বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা ওয়াকআউট করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আইনের কিছু নির্দিষ্ট ধারায় সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য বৈষম্যমূলক ও দ্বিমুখী নীতি রাখা হয়েছে, যা স্বাধীন বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

নতুন মানবাধিকার ও গুম সংক্রান্ত এই আইনগুলোতে বেশ কিছু নতুন বিচারিক প্রক্রিয়া ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে আদালতের তল্লাশি পরোয়ানা জারির ক্ষমতা, অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের মতো আধুনিক পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তির সম্পত্তি তার স্ত্রী ও নির্ভরশীলরা জীবনযাত্রার খরচ নির্বাহের জন্য ব্যবহার করতে পারবেন এবং দীর্ঘ পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি ‘গুমের সনদ’ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তদন্ত ও বিচারকার্য নির্ধারিত ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে এই আইনগুলোকে মানবাধিকার রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, বিরোধী দলগুলোর অব্যাহত সমালোচনা এবং ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে বিল পাসের এই ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে বেশ বড় ধরনের আলোচনার সৃষ্টি করেছে।